আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও তাদের মিত্রদের হামলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য আড়াল করছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। এমন মূল্যায়ন করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), বাহরাইন ও কুয়েতসহ কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর সরকারি বিবরণের সঙ্গে ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতির অমিল পাওয়া গেছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর সদর দপ্তর থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা ও বন্দরেও হামলার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর পাল্টা আক্রমণ চালায় তেহরান। এর জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে। সম্প্রতি ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর হামলার শিকার হয়েছে সৌদি আরবও।
ইরান ও হুথিরা পাইপলাইন, জ্বালানি স্থাপনা এবং একটি ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর দেওয়া বিবরণের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে।
সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, হুথিদের একটি ড্রোন হামলায় দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর ধাহরানে অবস্থিত সদর দপ্তরে ‘সীমিত অগ্নিকাণ্ড’ ঘটে। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, আরামকোর সদর দপ্তরের ওপরের তিনটি তলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী আমিন নাসেরের কার্যালয়ও রয়েছে। ভবনটির ছাদের একাংশ ধসে পড়েছে এবং জানালা ও দরজা উড়ে গেছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ডে হামলার কথা স্বীকার করলেও অনেক ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির জন্য আকাশ থেকে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করেছে। কিন্তু উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে কিছু স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া গেছে। হামলার ধরন থেকেও লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে হামলাকারীদের বিস্তারিত তথ্য থাকার ইঙ্গিত মিলেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের ছাদে হামলা হয়েছিল। এতে কেন্দ্রটির চারটি চুল্লির একটিকে জরুরি ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। রয়টার্সকে একজন ইরানি কর্মকর্তা ও উপসাগরীয় অঞ্চলের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা এবং বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রটির অবস্থান সম্পর্কে ইরানের কাছে তথ্য ছিল।
কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনাতেও হামলার ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত জানার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় গ্যাসকে তরলে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় শীতলীকরণ সরঞ্জাম রাখা ‘কোল্ড বক্স’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের সরঞ্জাম তৈরি করতে কয়েক মাস সময় লাগে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকারি বিবরণ ও বাস্তব ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে বড় অমিলের উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরান একাধিকবার বন্দরটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। কখনো মেরামতকাজ শেষ হওয়ার পরও সেখানে নতুন করে হামলা হয়েছে।
গত ৩ মার্চ ফুজাইরা বন্দরে প্রথম হামলায় দুটি তেলের ট্যাংকে আগুন ধরে যায়। কয়েক দিন ধরে সেগুলো জ্বলতে থাকে। উপগ্রহচিত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানায়, পরবর্তী হামলায় বন্দরের একটি ‘ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ড’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৬২টি পাইপলাইনের সমন্বয়ে তৈরি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তেলের টার্মিনাল থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য জাহাজে তোলার স্থানে নেওয়া হয়।
আমিরাতের কর্মকর্তারা ওই হামলাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির জন্য আকাশ থেকে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করেছিলেন। তবে রয়টার্সের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সরকারি ব্যাখ্যার সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্রের মিল নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রামানান কৃষ্ণমূর্তি আমিরাতের সরকারি ব্যাখ্যার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি হামলাটিকে আমিরাতের ‘মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
রয়টার্স জানায়, মার্চে ফুজাইরা বন্দরে পরবর্তী হামলায় আরেকটি ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটি দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেয় আমিরাত। মার্চের শেষ নাগাদ বন্দরটি পুরোপুরি সচল হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু মে মাসে ইরান আবারও সেখানে হামলা চালায়। এবার একটি ড্রোন মার্চে প্রথম হামলার শিকার ম্যাট্রিক্স ম্যানিফোল্ডের সঙ্গে যুক্ত পাইপলাইনে আঘাত হানে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফুজাইরা বন্দর থেকে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের রপ্তানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লেগেছে। গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় বারবার হামলার ফলে আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা ও রপ্তানি কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

