স্পোর্টস ডেস্ক

মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের নিষ্প্রাণ ড্রয়ের হতাশা ভুলে অবশেষে নিজেদের চেনা ছন্দে ফিরেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ফিলাডেলফিয়ার লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ডে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে হাইতিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে কার্লো আনচেলত্তির দল।

প্রথমার্ধেই তিন গোল করে ম্যাচের ভাগ্য কার্যত নিজেদের পক্ষে নিয়ে নেয় সেলেসাওরা। ২০০২ বিশ্বকাপের পর এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচের প্রথমার্ধে তিন গোল করার কীর্তি গড়ল ব্রাজিল। ভিনিসিয়াস জুনিয়রের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং ম্যাথিউস কুহনার জোড়া গোলে ফিলাডেলফিয়ার গ্যালারিতে ফিরে আসে সেই চেনা সাম্বার ছন্দ।

ম্যাচটি ঘিরে শুরু থেকেই ছিল বাড়তি আগ্রহ। একদিকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার ব্রাজিল, অন্যদিকে বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করতে নামা হাইতি। অভিজ্ঞতায় ভরপুর একাদশ নিয়ে মাঠে নামেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি।

ব্রাজিলের শুরুর একাদশের গড় বয়স ছিল ৩০ বছর, যা ১৯৬২ সালের পর বিশ্বকাপে তাদের সবচেয়ে বয়স্ক শুরুর একাদশ। ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সির পরিবর্তে বিশেষ কালো-নীল অ্যাওয়ে কিটে মাঠে নামে সেলেসাওরা, যা বিষাক্ত ডার্ট ফ্রগের রঙ থেকে অনুপ্রাণিত।

অন্যদিকে সম্পূর্ণ সাদা পোশাকে মাঠে নামা হাইতি শুরু থেকেই সাহসী ফুটবল উপহার দেয়। প্রতিপক্ষের নাম বা খ্যাতি তাদের ওপর কোনো চাপ তৈরি করতে পারেনি। তবে সময় যত গড়িয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে দুই দলের সামর্থ্যের পার্থক্য।

শুরুর দিকে অবশ্য ব্রাজিলের খেলায় কিছুটা ধীরগতি দেখা যায়। মাঝমাঠে লুকাস পাকেতা কয়েকটি সহজ বল হারালে হাইতি পাল্টা আক্রমণের সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করে। তবে অভিজ্ঞ ক্যাসেমিরো দ্রুতই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন।

১২তম মিনিটে রাফিনহার শট জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়। সেই মুহূর্তের পরই যেন ঘুম ভাঙে ব্রাজিলের। আক্রমণের ধার বাড়িয়ে একের পর এক চাপ তৈরি করতে থাকে তারা।

অবশেষে ২৩তম মিনিটে গোলের দেখা পায় সেলেসাওরা। বাঁ প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে বক্সে ঢুকে জোরালো শট নেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। হাইতির গোলরক্ষক প্লাসাইড প্রথম প্রচেষ্টায় তা ঠেকিয়ে দিলেও বল পুরোপুরি বিপদমুক্ত করতে পারেননি।

ফিরতি বলে হাইতির ডিফেন্ডার দেলাক্রোয়েক্স ও ব্রাজিলের ম্যাথিউস কুহনার লড়াইয়ে বল শেষ পর্যন্ত জালে জড়িয়ে যায়। গোলটি কুহনার নামেই নথিভুক্ত হয়। এরপর পরিচিত সার্ফিং উদযাপনে মেতে ওঠেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড।

গোল পাওয়ার পর আর পেছনে তাকায়নি ব্রাজিল। ৩৬তম মিনিটে আবারও স্কোরবোর্ডে নাম লেখান কুহনা। মাঝমাঠে হাইতির আক্রমণ থামিয়ে দেন ক্যাসেমিরো। সেখান থেকে বল পেয়ে ভিনিসিয়াস জুনিয়র নিখুঁতভাবে খুঁজে নেন বক্সে থাকা কুহনাকে।

ভারসাম্য হারানোর মুহূর্তেও অসাধারণ দক্ষতায় বাম পায়ের শটে বল জালের ছাদে পাঠিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল পূর্ণ করেন তিনি। প্রথমার্ধেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন পুরোপুরি চলে গেছে ব্রাজিলের হাতে।

এরপর অবশ্য ব্রাজিল শিবিরে কিছুটা উদ্বেগ দেখা দেয়। শারীরিক সমস্যার কারণে রাফিনহাকে মাঠ ছাড়তে হয়। তাঁর জায়গায় মাঠে নামেন বোর্নমাউথের তরুণ উইঙ্গার রায়ান।

তবে প্রথমার্ধের নাটক তখনো শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে আসে ম্যাচের সবচেয়ে নান্দনিক গোলটি। মাঝমাঠ থেকে লুকাস পাকেতার অসাধারণ ডিফেন্স-চেরা পাস হাইতির রক্ষণভাগকে মুহূর্তেই ভেঙে দেয়।

গতির সঙ্গে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ভিনিসিয়াস জুনিয়র একাই এগিয়ে যান গোলরক্ষকের সামনে। এরপর ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠিয়ে স্কোরলাইন করেন ৩-০।

বিরতির আগে শুধু আক্রমণেই নয়, রক্ষণেও নিজের উপস্থিতি জানান দেন পাকেতা। হাইতির বেলগার্ডের বিপজ্জনক আক্রমণ স্লাইডিং ট্যাকলে থামিয়ে ব্রাজিলের ক্লিনশিটও ধরে রাখেন তিনি।

প্রথম ৪৫ মিনিট শেষে ফিলাডেলফিয়ার গ্যালারিতে তখন একটাই ছবি—হলুদ-নীল সমর্থকদের উচ্ছ্বাস আর সাম্বার ছন্দ। মরক্কোর বিপক্ষে থেমে যাওয়া ব্রাজিল যেন হাইতির বিপক্ষে ফিরে পেয়েছে নিজেদের পরিচিত ফুটবল পরিচয়।

প্রথমার্ধের তিন গোল শুধু স্কোরলাইনের পার্থক্য নয়, বরং আনচেলত্তির ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ারও ঘোষণা।

Share.
Exit mobile version