স্পোর্টস ডেস্ক
মরক্কোর বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ের পর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে প্রথম জয়ের দেখা পেয়েছে ব্রাজিল। হাইতিকে ৩-০ গোলে হারালেও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের পারফরম্যান্স নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
শনিবার (২০ জুন) ফিলাডেলফিয়ার লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ডে প্রথমার্ধের দাপুটে ফুটবলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল কার্লো আনচেলত্তির দল, কিন্তু বিরতির পর অনেকটাই গতি হারিয়ে ফেলে সেলেসাওরা।
ম্যাথিউস কুনিয়ার জোড়া গোল এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে বড় জয় পেলেও ব্রাজিলকে দেখা গেছে অনেকটাই হিসাবি ফুটবল খেলতে। দ্বিতীয়ার্ধে গোলের ব্যবধান বাড়ানোর বদলে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে সময় পার করার কৌশল নিয়েছিল আনচেলত্তির দল। গ্রুপ ‘সি’-তে মরক্কোর সঙ্গে শীর্ষস্থান দখলের লড়াইয়ে ভবিষ্যতে গোল পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে এই সিদ্ধান্তই ব্রাজিলের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
ম্যাচের আগে থেকেই আলোচনায় ছিল আনচেলত্তির একাদশ নির্বাচন। অভিজ্ঞতায় ভরপুর ব্রাজিলের শুরুর একাদশের গড় বয়স ছিল ৩০ বছর, যা ১৯৬২ সালের পর বিশ্বকাপে তাদের সবচেয়ে বয়স্ক শুরুর একাদশ। ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সির পরিবর্তে বিশেষ কালো-নীল অ্যাওয়ে কিট পরে মাঠে নামে সেলেসাওরা। অন্যদিকে সাদা পোশাকে হাইতি শুরু থেকেই সাহসী মানসিকতা নিয়ে খেলতে নামে এবং ব্রাজিলের নাম বা ইতিহাস তাদের ভীত করতে পারেনি।
শুরুর মিনিটগুলোতে অবশ্য ব্রাজিলকে কিছুটা অস্বস্তিতেই দেখা যায়। মাঝমাঠে লুকাস পাকেতার কয়েকটি ভুল পাস এবং আক্রমণে ধীরগতি হাইতিকে পাল্টা আক্রমণের সুযোগ তৈরি করে দেয়। ক্যাসেমিরো অবশ্য অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন।
দ্বাদশ মিনিটে রাফিনহা গোল করলেও অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়। সেই মুহূর্তের পর ধীরে ধীরে আক্রমণের ধার বাড়াতে শুরু করে ব্রাজিল।
অবশেষে ২৩তম মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। বাঁ প্রান্ত দিয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত প্রচেষ্টা হাইতির গোলরক্ষক জনি প্লাসিডে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি। ফিরতি বল নিয়ে হাইতির ডিফেন্ডার দেলাক্রোয়েক্সের সঙ্গে লড়াইয়ের পর বল জালে জড়িয়ে যায়। গোলের কৃতিত্ব দেওয়া হয় কুনিয়াকেই। এরপর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফরোয়ার্ড নিজের পরিচিত সার্ফিং উদযাপনে মেতে ওঠেন।
গোলের পর ব্রাজিল আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ৩৬তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন কুনিয়া। মাঝমাঠে হাইতির আক্রমণ আটকে দেন ক্যাসেমিরো। সেখান থেকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত পাস পেয়ে বক্সের ভেতর ভারসাম্য হারানোর মুহূর্তেও অসাধারণ দক্ষতায় বাঁ পায়ের শটে বল জালের ছাদে পাঠান কুনিয়া।
এরপর ব্রাজিল শিবিরে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়। শারীরিক সমস্যার কারণে রাফিনহাকে মাঠ ছাড়তে হয়। তার জায়গায় মাঠে নামেন তরুণ রায়ান। তবে প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে আবারও ব্রাজিলের আক্রমণ ঝলসে ওঠে।
যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে আসে ম্যাচের সবচেয়ে নান্দনিক গোলটি। মাঝমাঠ থেকে লুকাস পাকেতার অসাধারণ ডিফেন্স-চেরা পাস হাইতির রক্ষণভাগকে মুহূর্তেই ভেঙে দেয়। বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এরপর গোলরক্ষকের সামনে এসে ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠান রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে গোল পেলেন ভিনিসিয়ুস। একই সঙ্গে ২০০২ সালের পর প্রথমবার কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচের প্রথমার্ধেই তিন গোল করার কীর্তি গড়ে ব্রাজিল।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। বড় ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর ব্রাজিল আর আগের মতো আক্রমণাত্মক ছিল না। বরং হাইতি সাহস বাড়িয়ে মাঠে নামে এবং ৪-৪-২ ছকে মাঝমাঠে চাপ তৈরি করে।
৫৬ মিনিটের পর থেকে হাইতি বেশ কয়েকবার ব্রাজিলের রক্ষণভাগে আক্রমণ চালায়। বাম প্রান্ত দিয়ে তাদের আক্রমণভাগ কিছুটা বিপদ তৈরি করলেও মারকিনিয়োস, গ্যাব্রিয়েল এবং ক্যাসেমিরোর অভিজ্ঞতায় বড় সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।
৬৪তম মিনিটে হাইতির আদের দুর্দান্ত হেড প্রায় গোলেই পরিণত হয়েছিল। কিন্তু অসাধারণ প্রতিক্রিয়ায় অ্যালিসন বেকার তা রুখে দেন। ব্রাজিলের গোলরক্ষককে এরপরও কয়েকবার সতর্ক থাকতে হয়।
ম্যাচের শেষ আধঘণ্টায় আনচেলত্তি তরুণদের সুযোগ দেন। মাঠে নামেন এন্ড্রিক ও গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি। ৬৮ মিনিটে ভিনিসিয়ুস ও ব্রুনো গিমারেসের সুন্দর সমন্বয়ে মার্টিনেল্লির দুর্দান্ত শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে।
৭৮ মিনিটে এন্ড্রিক বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়। শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হলেও ৩-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে ব্রাজিল।
ফলাফল ব্রাজিলের পক্ষে গেলেও ম্যাচটি আবারও দেখিয়ে দিল, আনচেলত্তির দল এখনো সেই পুরোনো সাম্বার ছন্দ পুরোপুরি ফিরে পায়নি। প্রথমার্ধে ছিল আক্রমণের ঝলক, দ্বিতীয়ার্ধে ছিল হিসাবি নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বকাপের কঠিন পথ পাড়ি দিতে হলে শুধু জয় নয়, ব্রাজিলকে খুঁজে পেতে হবে সেই হারিয়ে যাওয়া নান্দনিক ফুটবলের ধার, সেই চিরচেনা জোগো বনিতো।

