স্পোর্টস ডেস্ক

ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘কে’-এর উদ্বোধনী ম্যাচটি ছিল দুই ভিন্ন গল্পের মঞ্চ। একদিকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নতুন রেকর্ড গড়ার রাত, অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর ইতিহাস লেখার সুযোগ। টেক্সাসের এনআরজি স্টেডিয়ামে শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের ড্রয়ে থামে লড়াই।

ম্যাচের শুরুতে এগিয়ে গিয়েও জয় ধরে রাখতে পারেনি পর্তুগাল। আর মাঠের বাইরে ইবোলা প্রাদুর্ভাবসহ নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে ফিরে পর্তুগিজদের রুখে দিয়ে অনন্য এক কীর্তি গড়েছে আফ্রিকার দলটি।

৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে ডিআর কঙ্গো শুধু শক্তিশালী পর্তুগালের বিপক্ষে পয়েন্টই ছিনিয়ে নেয়নি,  অর্জন করেছে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের প্রথম গোল এবং প্রথম পয়েন্টের গৌরবও।

ম্যাচটি ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্যও এক ঐতিহাসিক উপলক্ষ। ৪১ বছর ১৩২ দিন বয়সে মাঠে নেমে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েন। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল কানাডার সাবেক মিডফিল্ডার আতিবা হাচিনসনের দখলে। একই সঙ্গে ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মাঠে নেমে বিরল এক মাইলফলকও স্পর্শ করেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। এর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলার তালিকায় লিওনেল মেসি ও গিয়ের্মো ওচোয়ার পাশে নিজের নামও যুক্ত করেন তিনি।

রবের্তো মার্তিনেসের দল শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। তার ফলও আসে দ্রুত। ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটে পেদ্রো নেতোর বাঁ প্রান্ত থেকে ভেসে আসা নিখুঁত ক্রসে দারুণ এক হেডে বল জালে জড়ান জোয়াও নেভেস। প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের এই তরুণ মিডফিল্ডারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এটি ছিল চতুর্থ গোল।

শুরুতে ধাক্কা খেলেও ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে ডিআর কঙ্গো। কাউন্টার অ্যাটাকভিত্তিক ফুটবলে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে তারা পর্তুগালের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। আর্থার মাসুয়াকুর নিখুঁত ক্রসে অসাধারণ এক হেডে গোল করে কঙ্গোর সমর্থকদের উল্লাসে ভাসান ইওয়ান উইসা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ডিআর কঙ্গোর প্রথম গোলটি আসে ঠিক এমন এক নাটকীয় মুহূর্তেই।

বিরতির পর জয়ের লক্ষ্যে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে পর্তুগাল। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে তারা। ৫৫তম মিনিটে জোয়াও ক্যানসেলোর দুর্দান্ত অ্যাক্রোবেটিক শট জালে জড়ালে পর্তুগিজ সমর্থকেরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। কিন্তু সহকারী রেফারির অফসাইডের পতাকায় সেই আনন্দ মুহূর্তেই থেমে যায়।

ম্যাচের ৭১তম মিনিটে আক্রমণের ধার বাড়াতে পেদ্রো নেতোর জায়গায় রাফায়েল লিয়াও এবং বার্নার্দো সিলভার বদলে ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওকে নামান মার্তিনেস। কিন্তু চান্সেল এমবেম্বার নেতৃত্বে কঙ্গোর রক্ষণভাগ ছিল অবিশ্বাস্যভাবে সংগঠিত। ব্রুনো ফার্নান্দেস, রাফায়েল লিয়াও কিংবা রোনালদো—কেউই কাঙ্ক্ষিত জায়গা খুঁজে পাননি।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পর্তুগালের হতাশাও বাড়তে থাকে। ৮০ মিনিট পেরিয়ে গেলেও সমতা ভাঙার মতো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি ইউরোপিয়ান দলটি। শেষ পর্যন্ত ১-১ ব্যবধানেই শেষ হয় ম্যাচ।

সকালে আলজেরিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকের পর ফুটবল বিশ্বের সব আলো ছিল রোনালদোর দিকে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার জবাব দিতে পারেননি পর্তুগিজ মহাতারকা। পুরো ম্যাচে তিনি মাত্র দুটি শট নেওয়ার সুযোগ পান, যার একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। কঙ্গোর সুসংগঠিত রক্ষণভাগ এমনভাবে তাঁকে আটকে রেখেছিল যে জোয়াও নেভেসের গোলটি ছাড়া পর্তুগাল পুরো ম্যাচে আর কোনো শট অন-টার্গেট রাখতে পারেনি।

এই ড্রয়ের ফলে বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে পর্তুগালের জার্সিতে টানা ১০ ম্যাচ গোলশূন্য থাকার হতাশাজনক রেকর্ডে পৌঁছালেন রোনালদো, যা তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দীর্ঘ গোলখরা।

অন্যদিকে, মাঠের বাইরে প্রতিকূলতা আর মাঠের ভেতরে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গেই লড়ে পাওয়া এই এক পয়েন্ট ডিআর কঙ্গোর কাছে জয়ের সমান। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার পাশাপাশি গ্রুপ ‘কে’-এর সমীকরণও জটিল করে তুলেছে আফ্রিকার চিতা খ্যাত দলটি।

Share.
Exit mobile version