আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল আলোচিত সমঝোতা চুক্তির দাপ্তরিক খসড়া প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রশাসন। ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (MOU)’ শিরোনামের এই খসড়া নথিতে সামরিক অভিযান বন্ধ, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ ১৪টি বিষয়ে দুই পক্ষের প্রস্তাবিত সমঝোতার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা এই নথিতে বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।

ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক

১. সামরিক অভিযান বন্ধ ও যুদ্ধের অবসান

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং চলমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা এই সমঝোতা স্মারকে (MOU) স্বাক্ষর করে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিচ্ছে। এখন থেকে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু করবে না এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকবে। একই সঙ্গে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করছে।

চূড়ান্ত চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং এই ধারায় উল্লেখিত অন্যান্য বিষয় নিশ্চিত করা হবে।

২. সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখাবে এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করবে।

৩. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা সম্পন্ন এবং তা অর্জনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছে। পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।

৪. মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার ও সেনা সরানো

এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ এবং যেকোনো ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করবে। ৩০ দিনের মধ্যে এই নৌ অবরোধ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা হবে।

এই সময়ের মধ্যে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব সময়ের জাহাজ চলাচলের অনুপাতে পুনর্বহাল করা হবে, যা ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পক্ষ থেকে কার্যকর করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র আরও অঙ্গীকার করছে, চূড়ান্ত চুক্তির পর ৩০ দিনের মধ্যে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিকটবর্তী এলাকা থেকে তাদের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করবে।

৫. হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল

এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যবহার করে ৬০ দিনের জন্য পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীত পথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বিনা শুল্কে চলাচলের ব্যবস্থা করবে।

বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে। তবে কারিগরি ও সামরিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং ইরানের পক্ষ থেকে মাইন অপসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে এই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা হবে।

আন্তর্জাতিক আইন এবং হরমুজ প্রণালীর উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র ওমানের সঙ্গে আলোচনা করবে এবং পারস্য উপসাগরের অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবার কাঠামো নির্ধারণ করবে।

৬. ইরানের পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি সুনির্দিষ্ট এবং পারস্পরিকভাবে সম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নের অঙ্গীকার করছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও কাঠামো ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অনুমোদন যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করবে।

৭. ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে একটি পারস্পরিক সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গভর্নর বোর্ডের প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা—প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় ধরনের নিষেধাজ্ঞা—অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই স্বীকার করছে যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনার মাধ্যমে এসব বিষয় দ্রুত সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করছে দুই পক্ষ।

৮. ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম

ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র পুনরায় নিশ্চিত করছে যে তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি করবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র সম্মত হয়েছে যে, সপ্তম ধারায় উল্লেখিত সময়সূচি অনুযায়ী পারস্পরিক সম্মত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইরানের মজুত করা সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আইএইএ’র তত্ত্বাবধানে নির্ধারিত স্থানে তা নিষ্ক্রিয় করার জন্য ন্যূনতম পদ্ধতি হিসেবে ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমানোর (down blending) প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।

দুই পক্ষ আরও সম্মত হয়েছে যে, চূড়ান্ত চুক্তিতে একটি সন্তোষজনক কাঠামো নির্ধারণের পর ইরানের পারমাণবিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং অন্যান্য পারস্পরিক সম্মত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।

চূড়ান্ত চুক্তিতে এই ধারার সব বিষয় নিশ্চিত করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই উল্লেখিত পারমাণবিক বিষয়গুলোর গুরুত্ব স্বীকার করছে এবং পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনার মাধ্যমে এসব বিষয় দ্রুত সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করছে।

৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা

চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং এই অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করবে না।

১০. ইরানের তেল রপ্তানি ও সংশ্লিষ্ট সেবায় ছাড়

যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরপরই এবং নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও এর উপজাত দ্রব্য রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র (waiver) প্রদান করবে।

এ ছাড়া ব্যাংকিং লেনদেন, বিমা, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের সেবার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়া হবে।

১১. ইরানের জব্দ তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ

যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করছে, এই সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের পর ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জব্দ বা সীমাবদ্ধ করা সব তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

এই তহবিল ছাড়ের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুন নিয়ে আলোচনা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পারস্পরিকভাবে সম্মত হবে।

এই অর্থ আগের অ্যাকাউন্টে রাখা হোক বা অন্যত্র স্থানান্তর করা হোক, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক মনোনীত যেকোনো চূড়ান্ত সুবিধাভোগীকে অর্থ প্রদানের জন্য তা সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য হবে।

যুক্তরাষ্ট্র এ জন্য প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স ও অনুমোদন দেওয়ার অঙ্গীকার করছে।

১২. বাস্তবায়ন তদারকির ব্যবস্থা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র সম্মত হয়েছে যে, এই সমঝোতা স্মারকের সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা বা কমিটি গঠন করা হবে।

১৩. চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু

এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এবং এর ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার বাস্তবায়ন শুরু ও তা অব্যাহত থাকার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র অবশিষ্ট ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে।

১৪. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন

চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কের বরফ গলাতে এই ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা কমবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্যেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। নির্ধারিত ৬০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষ শর্তগুলো কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করে, তার ওপরই নির্ভর করবে সমঝোতা স্মারকের ভবিষ্যৎ।

Share.
Exit mobile version