আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তির আনুষ্ঠানিক খসড়া প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন। এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ও হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ে দুই পক্ষ একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখায় সম্মত হয়েছে।
গত বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই কূটনৈতিক দলিলের ১৪টি দফা আনুষ্ঠানিকভাবে পড়ে শোনানো হয়। মূলত দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই চুক্তির মূল ধারাগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ না করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। রোববার দুই দেশের মধ্যে অনলাইনে (ইলেকট্রনিক্যালি) সই হওয়া এই ঐতিহাসিক নথির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)’।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফা প্রকাশ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, আগামী শুক্রবার দুই দেশের প্রতিনিধিরা এই সমঝোতা স্মারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করবেন। চুক্তি স্বাক্ষরের পর চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদনের জন্য দুই পক্ষ ৬০ দিনের একটি সময়সীমা পাবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এর আগে এই চুক্তির একটি খসড়া ফাঁস হলেও, মূল নথিতে ইরানের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুদ ধ্বংস করার জন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সরাসরি নজরদারিতে একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে।
এই চুক্তির প্রধানতম শর্ত অনুযায়ী, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবকটি যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। ওয়াশিংটন আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের অতিরিক্ত সেনা সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর জবাবে ইরানও হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সমুদ্রসীমা থেকে সব ধরনের মাইন অপসারণ করতে সম্মত হয়েছে।
একই সঙ্গে ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক সহযোগীরা অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল তহবিল গঠন করবে। চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের তেল রপ্তানি এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর থেকে সাময়িক মওকুফনামা জারি করবে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। অন্যদিকে, ইরানও স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে যে তারা কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না এবং তাদের বর্তমান পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ সীমার মধ্যে আটকে রাখবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা সফল হলে তা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। ৬০ দিনের আলোচনার পর দুই পক্ষের মধ্যে যে চূড়ান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে, তা পরবর্তীতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত করা হবে। এর ফলে দীর্ঘ কয়েক দশকের ইরান-মার্কিন বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিষদের চূড়ান্ত প্রস্তাবের মাধ্যমেই এই শান্তি প্রক্রিয়ার স্থায়ী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা হবে।

