বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তমকুমার শুধু একজন অভিনেতার নাম নন, তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পর্দায় তাঁর এক চিলতে হাসি, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গি কিংবা ব্যক্তিত্বের নিজস্বতা—মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও দর্শকের কাছে এতটুকু ফিকে হয়নি। আজ ৩ সেপ্টেম্বর বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তির জন্মশতবর্ষ। ১৯২৬ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় পরবর্তী সময়ে ‘উত্তমকুমার’ নামেই হয়ে ওঠেন বাঙালির মহানায়ক।
উত্তমকুমারকে মনে পড়লেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে তাঁর হাসি, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জনপ্রিয় জুটি কিংবা বাংলা সিনেমার রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ সাফল্য। কিন্তু তাঁকে শুধু রোমান্টিক নায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর অভিনয়জীবনের বড় একটি অধ্যায় আড়ালে থেকে যায়। কারণ তাঁর অন্যতম বড় কৃতিত্ব ছিল নিজের তৈরি তারকা-ইমেজের মধ্যে আটকে না থেকে সময়ের সঙ্গে অভিনয়ের ধরন ও চরিত্রের পরিসর বদলে নেওয়া।
১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন উত্তমকুমার। শুরুর কয়েক বছর ছিল কঠিন সংগ্রামের। একের পর এক ছবিতে প্রত্যাশিত সাফল্য না আসায় ক্যারিয়ারে হতাশার সময়ও এসেছে। পরে ‘বসু পরিবার’ এবং ১৯৫৩ সালের ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন জনপ্রিয়তার জন্ম দেয়।
পঞ্চাশের দশকে উত্তমকুমারের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে রোমান্টিক নায়ক। ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’, ‘সপ্তপদী’সহ একের পর এক ছবিতে প্রেম, বিরহ ও আবেগের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করে। তাঁর অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল অতিরিক্ত নাটকীয়তার বদলে চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর ও শরীরী ভাষার মাধ্যমে আবেগ প্রকাশ করা। ফলে অনেক সময় তাঁর অভিনয় সংলাপের বাইরেও দর্শকের কাছে পৌঁছে যেত।
ষাটের দশকে উত্তমকুমারের অভিনয়ে আরও বড় পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি শুধু জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর না করে চরিত্রের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘চিড়িয়াখানা’ এবং ‘নায়ক’-এর মতো ছবিতে তাঁর চরিত্র ও অভিনয়ের ধরন আগের রোমান্টিক নায়ক-ইমেজের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে।
এই বিবর্তনের অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’। ১৯৬৬ সালের এই ছবিতে উত্তমকুমার অভিনয় করেন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে। বাইরে থেকে আত্মবিশ্বাসী ও সফল এই তারকার ভেতরে ছিল অনুশোচনা, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও অতীতের চাপ। নিজের তারকা-ইমেজের সঙ্গে চরিত্রটির মানসিক দ্বন্দ্বকে মিলিয়ে উত্তমকুমারের অভিনয় ছবিটিকে ভিন্ন মাত্রা দেয়।
‘নায়ক’-এর বিশেষত্ব এখানেই যে, ছবির অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে উত্তমকুমারের বাস্তব তারকা-পরিচয়ের একটি অনুরণন দর্শক অনুভব করতে পারেন। পর্দার সফল নায়ক এবং তার আড়ালে থাকা মানুষের মধ্যে যে দূরত্ব, সেই দ্বন্দ্ব তাঁর অভিনয় আরও গভীর করে তোলে। ফলে ‘নায়ক’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, উত্তমকুমারের অভিনয়জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
সত্তরের দশকে এসে তাঁর অভিনয়ের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। ‘অমানুষ’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘অগ্নীশ্বর’, ‘মৌচাক’, ‘সব্যসাচী’ ও ‘দুই পৃথিবী’র মতো বিভিন্ন ঘরানার ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। রহস্যময় চরিত্র থেকে শুরু করে গম্ভীর ও সামাজিক বাস্তবতার চরিত্র—বিভিন্ন ভূমিকায় নিজের তারকা-ব্যক্তিত্বকে চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করেছেন তিনি। অভিনয়ের এই বৈচিত্র্যই তাঁকে শুধু জনপ্রিয় নায়ক নয়, বহুমাত্রিক অভিনেতা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।
অভিনয়ের পাশাপাশি উত্তমকুমার প্রযোজক, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হিসেবেও কাজ করেছেন। সংগীত পরিচালনা এবং গান গাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর কাজের নজির রয়েছে। অর্থাৎ চলচ্চিত্রকে তিনি কেবল অভিনয়ের জায়গা হিসেবে দেখেননি; নির্মাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও নিজের সৃজনশীলতা প্রয়োগ করেছেন।
উত্তমকুমারের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। পঞ্চাশের দশকের স্বপ্নের রোমান্টিক নায়ক ধীরে ধীরে ষাটের দশকে হয়ে ওঠেন জটিল ও বহুমাত্রিক চরিত্রের অভিনেতা। সত্তরের দশকে তাঁর অভিনয়ে আসে আরও পরিণত চরিত্রের ছাপ। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তিনি দীর্ঘদিন দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকতে পেরেছিলেন।
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন উত্তমকুমার। তাঁর মৃত্যুর পর ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর অভিনীত অনেক চলচ্চিত্র নতুন করে মূল্যায়িত হয়েছে। জন্মশতবর্ষে এসে উত্তমকুমার তাই শুধু স্মৃতির নায়ক নন, বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনয়, তারকা-সংস্কৃতি ও দর্শকের রুচি বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়।
‘মহানায়ক’ শব্দটি উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে শুধু জনপ্রিয়তার স্বীকৃতি নয়। এটি একজন অভিনেতার দীর্ঘ পথচলারও প্রতিফলন—যেখানে সংগ্রামী তরুণ অভিনেতা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন জনপ্রিয় নায়ক, তারকা, বহুমাত্রিক অভিনেতা এবং শেষ পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
উত্তমকুমারের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই—তিনি শুধু তাঁর সময়কে প্রতিনিধিত্ব করেননি, নিজের অভিনয় দিয়ে সেই সময়ের রুচি, স্বপ্ন ও আবেগকেও প্রভাবিত করেছিলেন। তাই পর্দার নায়ক উত্তমকুমার সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও বাঙালির কাছে মহানায়ক।

