আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দুই যুগেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার মধ্য দিয়ে বদলে গিয়েছিল বিশ্ব রাজনীতি ও নিরাপত্তার চিত্র। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার সমন্বিত হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন। এরপর শুরু হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সামরিক অভিযান এবং বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থার বিস্তার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
আজ ১১ সেপ্টেম্বর হামলার ২৫তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন ও পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলে নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ২৫ বছর পরও হামলাটির রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
২০০১ সালের ওই দিন আল-কায়েদার ১৯ সদস্য চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে। দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। তৃতীয় বিমানটি ওয়াশিংটনের কাছে পেন্টাগনে আছড়ে পড়ে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলে বিধ্বস্ত হয়। বিমানটিতে থাকা যাত্রীদের প্রতিরোধের পর এটি নির্ধারিত লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে পারেনি বলে তদন্তে উঠে আসে।
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার করে। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এবং ২০০৩ সালে ইরাকে যুদ্ধ শুরু হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে। বিমানবন্দর নিরাপত্তা জোরদার, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি এবং নজরদারি সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন করে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কাঠামো গড়ে তোলা হয়।
দীর্ঘ সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযানে আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও সক্ষমতা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন অভিযানে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হন। ২০২২ সালে আল-কায়েদার তৎকালীন নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরিও মার্কিন হামলায় নিহত হন। তবে সংগঠনটি পুরোপুরি বিলীন হয়নি।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৫ বছর পর আল-কায়েদা আগের তুলনায় দুর্বল হলেও বৈশ্বিক জিহাদি তৎপরতায় এখনো প্রভাবশালী। সংগঠনটি আগের মতো কেন্দ্রীভূত না থেকে বিভিন্ন আঞ্চলিক শাখা ও সহযোগী গোষ্ঠীর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। একই সময়ে ইসলামিক স্টেট বা আইএসসহ অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীও বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয়।
অর্থাৎ ৯/১১-এর পর সন্ত্রাসবাদের ধরনও বদলেছে। একসময় বড় আকারের সমন্বিত হামলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর প্রধান কৌশল। এখন অনেক সংগঠন তুলনামূলকভাবে বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোয় কাজ করছে। স্থানীয় সংঘাত, দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামো, অনলাইন প্রচারণা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে উগ্রবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তবে বৈশ্বিকভাবে সন্ত্রাসী সহিংসতার মাত্রা সবক্ষেত্রে বাড়েনি। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫৮২ জনে দাঁড়ায়। একই সময়ে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যাও ২২ শতাংশ কমে ২ হাজার ৯৪৪টিতে নেমে আসে। তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি অঞ্চল ও দেশে সন্ত্রাসের প্রভাব এখনো অত্যন্ত গুরুতর।
৯/১১-এর প্রভাব শুধু সামরিক ও নিরাপত্তা নীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সন্দেহ, বৈষম্য ও বিদ্বেষের ঘটনা বেড়ে যায়। একই সঙ্গে সন্ত্রাস দমনের নামে ব্যাপক নজরদারি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে বিতর্কও তীব্র হয়।
হামলার আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে উদ্ধারকর্মী ও প্রথম সাড়াদানকারীদের ওপর। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধুলো ও দূষণের সংস্পর্শে আসা অনেক মানুষ পরবর্তী বছরগুলোতে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। ২৫ বছর পরও ৯/১১-সম্পর্কিত অসুস্থতায় আক্রান্ত মানুষ ও তাদের পরিবার সহায়তা ও চিকিৎসার জন্য লড়াই করছেন।
সব মিলিয়ে ৯/১১ শুধু একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার স্মৃতি নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক বড় বাঁকবদলের প্রতীক। আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় কাঠামো দুর্বল হয়েছে, কিন্তু সন্ত্রাসবাদ নতুন সংগঠন, নতুন অঞ্চল ও নতুন কৌশলের মাধ্যমে রূপ বদলেছে। তাই ২৫ বছর পরও ৯/১১-এর শিক্ষা শুধু অতীত স্মরণের বিষয় নয়, বরং পরিবর্তিত সন্ত্রাসী হুমকি মোকাবিলায় ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

