আন্তর্জাতিক ডেস্ক
শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত তাপে ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন জলবায়ু গবেষকেরা। এই তাপজনিত মৃত্যুর পাশাপাশি এল নিনোর সঙ্গে যুক্ত খরা, দাবানল ও বন্যার কারণেও প্রাণহানি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত সময়ের জন্য এই অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এল নিনোর প্রভাব এবং তাপজনিত মৃত্যুর উচ্চ হার আগামী বছরের জুন বা জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিল। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে, যেখানে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ভারতে অতিরিক্ত প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশটিতে এসব মৃত্যুর বড় অংশ ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ঘটতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এবারের এল নিনোর তীব্রতা আগের অনেক ঘটনার তুলনায় বেশি। এ কারণে বিজ্ঞানীরা পরিস্থিতিকে ‘বিস্ময়কর’ এবং ‘গডজিলা-স্তরের’ বলে বর্ণনা করেছেন। প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা এল নিনো হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর প্রভাব আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
এই গবেষণার সহলেখক এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, সম্ভাব্য ৪ লাখ ৫১ হাজার মৃত্যুর সংখ্যা বিশাল মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে পরিবার, প্রতিবেশী, কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ মানুষের জীবন। কোথায় আগাম ব্যবস্থা নিলে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব, এই পূর্বাভাস তা চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে।
গবেষকেরা বলেন, উন্নত তাপমাত্রা পূর্বাভাস ব্যবস্থা, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র, অতিরিক্ত চিকিৎসাকর্মী এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হলে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলির সহলেখক তাম্মা কার্লটনও জরুরি সাড়া জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এই পূর্বাভাস তৈরি করতে বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলে তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গড় মাসিক তাপজনিত মৃত্যুর তথ্যের সঙ্গে আগামী মাসগুলোতে এল নিনোর কারণে সম্ভাব্য তাপমাত্রা বৃদ্ধির পূর্বাভাস মিলিয়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, চলতি এল নিনো ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতির একটি সম্ভাব্য চিত্রও তুলে ধরছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী কয়েক দশকে বর্তমানের চরম তাপমাত্রা আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এল নিনোর প্রভাবে খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও চাপ বাড়তে পারে। এর আগে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছিল, এল নিনোর প্রভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারে এবং খাদ্যের দামও বাড়তে পারে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ফ্রেডেরিকে অটো বলেন, এবারের এল নিনো এমন একটি জলবায়ু ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলছে, যা মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে আগেই অনেক বেশি উষ্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নজিরবিহীন তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে, যা স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও পানির সংকটকে আরও তীব্র করতে পারে।

