বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বকেয়া ও সরবরাহ সংকটের মধ্যেও আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের পর দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহে সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে পুরোনো বকেয়া, আমদানিনির্ভরতা ও জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতাকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থ বিভাগ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সরবরাহকারীর কাছে সরকারের মোট বকেয়া ছিল ৫২ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সরকার থেকে ৫৪ হাজার ৩৭ কোটি টাকা নগদ ভর্তুকি পেয়েছিল।
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ের পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাবে বলে তিনি আশা করছেন। দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থায় সংকট তৈরি হয়েছিল। সেটি মেরামতের পরও কার্গো পুনঃনির্ধারণের কারণে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহব্যবস্থার প্রায় ৮৮ শতাংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ১২ শতাংশ ঘাটতিও দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।
বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। বঙ্গোপসাগরে আবহাওয়া কিছুটা প্রতিকূল থাকায় লাইটারেজের মাধ্যমে কয়লা মোংলায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে দুটি কেন্দ্রই পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে, যাতে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। বর্তমানে দিনের বেলায় আদানি প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার পর প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে এই সরবরাহ গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ছিল।
জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার বেশি দামে এলএনজি কিনছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি চুক্তির কয়েকটি সরবরাহকারী ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। স্পট মার্কেটে দাম তুলনামূলক বেশি হলেও বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের সংকট কমাতে সরকার উচ্চমূল্যে এলএনজি সংগ্রহ করছে।
এদিকে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, দীর্ঘদিনের ভুল নীতি ও আমদানিনির্ভরতার কারণে জ্বালানি খাতে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, পুরোনো বকেয়া পরিশোধ ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে গিয়ে নতুন বকেয়া তৈরি হয়েছে, যার চাপ এখনো বিদ্যুৎ খাতে রয়েছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে দেশের স্থাপিত গ্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২৭ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াট। তবে ওই অর্থবছরে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে ১৬ হাজার ৬০৩ মেগাওয়াট। একই সময়ে দেশে ১৬ হাজার ৪০৭ গিগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়, যা মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১৬ শতাংশ।
সরকারের প্রত্যাশা, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া এবং পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার ফলে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের পর বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এতে শিল্প ও গৃহস্থালি গ্রাহকদের ভোগান্তিও কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

