নিজস্ব প্রতিবেদক

অতীতে স্বৈরাচারী শাসনামলে রাষ্ট্র গণমাধ্যমকে চোখ রাঙিয়ে কথা বললেও বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের পেশাগত সমস্যা সমাধানে সরকার প্রকৃত ‘সহযোগী অংশীদার’ হিসেবে কাজ করতে চায়।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বিশেষ বক্তা হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ডিইউজের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভাটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম দিদার। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে মহান স্বাধীনতার মূল চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সেই সময়ের শাসকরা বুঝেছিল, জনগণের কণ্ঠস্বর ও ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সংবাদপত্রের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, সংবাদপত্রের কালো দিবস শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়, বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকারের দিন। বর্তমানে গণমাধ্যমের সংকট এবং সাংবাদিকতা পেশার প্রতিকূল পরিবেশ একাকার হয়ে গেছে। তাই শুধু ৫০ বছর আগের সমস্যার মধ্যে আটকে থাকলে চলবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল মাধ্যমের নতুন চ্যালেঞ্জ বুঝে এর উদ্ভাবনী সমাধান বের করতে হবে।

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও অপব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বর্তমানে এআই ব্যবহার করে ঘরে বসেই সত্য কিংবা বিকৃত তথ্য তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। পরে এসব তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা ছড়িয়ে পড়ছে। এই নতুন প্রযুক্তিগত সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ বা নাগরিক সাংবাদিকতার বাস্তবতাকেও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং এটিকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এ লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার যতই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করুক না কেন, মালিকপক্ষ যদি সাংবাদিকদের স্বাধীনতা, সঠিক বেতন-ভাতা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ না দেয়, তাহলে প্রকৃত সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, যে গণমাধ্যম নিজেকে ‘শিল্প প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দাবি করবে, তাকে অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলতে হবে। একই সঙ্গে কর্মরত সাংবাদিক ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে মুনাফাভিত্তিক শিল্পের বাইরে জনকল্যাণে কাজ করা গণমাধ্যমকে সরকার বিশেষ প্রণোদনা ও সহযোগিতা দেবে।

গণমাধ্যম কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে এডিটরস কাউন্সিল, টেলিভিশন অ্যাসোসিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। খুব শিগগিরই আধা-বিচারিক (কোয়াসি-জুডিশিয়াল) ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শক্তিশালী ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠন করা হবে। ফ্যাসিবাদ-উত্তর বাংলাদেশের এটি অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হবে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাস্তবায়নে তথ্য মন্ত্রণালয়কে দিকনির্দেশনা দিতে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘নীতি নির্ধারণী ফোরাম’ গঠনের আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, গণমাধ্যম যদি সঠিক নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সবসময় প্রশ্নের মুখোমুখি রাখতে পারে, তাহলে রাষ্ট্র ও সরকার ভুল করার সুযোগ পাবে না।

অতীতের ফ্যাসিবাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের ভাইরাসকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। এটি আমাদের মনের অজান্তে লুকিয়ে থাকা স্বৈরাচারী মানসিকতার বিরুদ্ধে ‘অ্যান্টিভাইরাস’ হিসেবে কাজ করবে।

সভায় আরও বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, বাংলা ভিশনের প্রধান সম্পাদক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেলসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা।

Share.
Exit mobile version