চলতি বছরের জুন মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব জাস্টিস বা গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, শ্রমিক নির্যাতন এবং সীমান্ত সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএস।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) প্রকাশিত জুন ২০২৬-এর মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংগৃহীত তথ্য এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছেন। মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৫ এবং আহত ছিলেন ২৮৯ জন।
রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ২১টি ঘটনায় ৩ জন নিহত ও ১৪৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৮টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৩৬ জন আহত এবং বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ১৪টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ১১৫ জন আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে ২৫৭টি ঘটনায় মোট ৪ হাজার ৭৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২২টির বেশি মামলা হয়েছে, যেখানে ৬২৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ১ হাজার ২৬২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ৬৩টি ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হয়েছেন।
জুন মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৮ জন আহত, ৫ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন হুমকির মুখে পড়েন। এছাড়া ৫ জন সাংবাদিককে আটক এবং ৭টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। জুন মাসে অন্তত ১১টি ঘটনায় ১১ জনকে আটক এবং ৭টি মামলা দায়েরের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় জুন মাসে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে দুজন কথিত বন্দুকযুদ্ধে এবং একজন ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান। এছাড়া গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর সময় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন কারাগারে সাতজন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ১২টি ঘটনায় ৭ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ১২টি মন্দির, ১১টি প্রতিমা ও ৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। জুন মাসে ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৬ জন ধর্ষণের শিকার, যাদের অধিকাংশই শিশু ও কিশোরী। একই সময়ে ২৯১ শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে এবং ৫৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
শ্রমিক অধিকার পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। জুন মাসে শ্রমিক নির্যাতনের ৫৫টি ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ১৮৪ জন আহত হয়েছেন। কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে দুর্ঘটনায় আরও ৩৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পাঁচটি ঘটনায় দুজন নিহত, দুজন আহত এবং চারজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিনজন নিহত এবং ১২ জনকে আটক করার ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব জাস্টিস, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং সীমান্ত সহিংসতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

