চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একেএস স্টিলের কারখানায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতি মিনিটে ৫২টি স্টিল রিবার বা রড উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে আবুল খায়ের স্টিল। ১০৮ মিটার দৈর্ঘ্যের এসব রড উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এক মিনিটে সর্বাধিক স্টিল রিবার উৎপাদনের গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লিখিয়েছে।
একেএস স্টিলের কারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়ায় লাল-তপ্ত বিলেট একের পর এক রোলিং স্ট্যান্ড অতিক্রম করে অল্প সময়ের মধ্যেই নির্দিষ্ট মাপের রডে রূপ নেয়। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি রডের মানও নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন এই রোলিং মিলে জার্মানির এসএমএস গ্রুপের প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হয়েছে। এতে সর্বাধুনিক হিট-রিকভারি প্রযুক্তি ও ইকো ফ্লেম-প্লাস বার্নার যুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে নাইট্রোজেন অক্সাইডের নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে।
উত্তপ্ত বিলেট পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়ার আগেই রোলিং প্রক্রিয়ায় পাঠানো হয়। ফলে বিলেট পুনরায় গরম করতে তুলনামূলক কম জ্বালানি প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে পানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মাধ্যমে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প-সহনশীল স্টিল উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যবস্থায় মিয়ারড্রাইভ ব্লকের প্রতিটি পাসের জন্য আলাদা ড্রাইভ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন ব্যাসের রড উৎপাদনের ক্ষেত্রেও মানের সামঞ্জস্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করায় প্রতিটি রডের মান নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে একেএস।
প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ধারাবাহিকতায় একেএসের বার্ষিক স্টিল উৎপাদন সক্ষমতা এখন ৩০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ সক্ষমতা নিয়ে বাংলাদেশে স্টিল উৎপাদনে তারা শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
এর আগে ২০১৯ সালে আবুল খায়ের গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান শাহ সিমেন্টের কারখানায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভার্টিক্যাল রোলার মিল (ভিআরএম) স্থাপন করা হয়। প্রতিদিন ১৫ হাজার টন এবং বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন সিমেন্ট উৎপাদনে সক্ষম ওই ভিআরএম স্থাপনের বিষয়টিও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পায়।
শিল্পপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে দেশে প্রথমবারের মতো ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস (ইএএফ) চালু করে একেএস। উচ্চ তাপমাত্রায় স্ক্র্যাপ গলিয়ে স্টিল তৈরির এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রডের মান আরও উন্নত করার উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
একেএসের রয়েছে দেশের বৃহত্তম অক্সিজেন প্ল্যান্টগুলোর একটি, যার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ২৬০ টন। অক্সিজেন-নির্ভর অক্সিডেশন প্রক্রিয়ায় গলিত স্টিল থেকে ফসফরাসসহ বিভিন্ন অপদ্রব্য অপসারণ করা হয়। এতে উন্নতমানের ও ভূমিকম্প-সহনশীল স্টিল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে ২০২৫ সালে দেশে প্রথম স্টিল কোম্পানি হিসেবে ৭০০ গ্রেডের রড উৎপাদনের অনুমোদন পাওয়ার কথাও জানিয়েছে একেএস। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত স্টিল পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়েছে।
সীতাকুণ্ডের কারখানায় প্রতি মিনিটে উৎপাদিত ৫২টি রড দেশের বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উৎপাদন দক্ষতা ও মান নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়ে নতুন এই গিনেস রেকর্ড দেশের ইস্পাত শিল্পে আবুল খায়ের স্টিলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।

