আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউরোপজুড়ে ব্যক্তিগত ব্যবহার ও শিল্পখাত ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয়ের চাপে রয়েছে। গ্যাসের দাম এবং যানবাহনে পেট্রোল ভরার খরচ দ্রুত বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
যুক্তরাজ্য সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার আহ্বান জানালেও ইউরোপীয় কমিশন নাগরিকদের ঘরে বসে কাজ বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমানোর পরামর্শ দিয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে জ্বালানি সংকট তীব্র হতে পারে। এর আগে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির কারণে ইউরোপে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল। ফলে আবারও আলোচনায় এসেছে জ্বালানি স্বনির্ভরতার বিষয়টি।
এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপে পারমাণবিক শক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয় ক্ষেত্রেই এটিকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এটি কত দ্রুত কার্যকর সমাধান দিতে পারবে এবং কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় পারমাণবিক জ্বালানি সম্মেলনে ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, পারমাণবিক শক্তি থেকে সরে আসা ছিল একটি কৌশলগত ভুল। ১৯৯০ সালে ইউরোপ তার মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করত পারমাণবিক শক্তি থেকে, যা বর্তমানে কমে গড়ে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
এর ফলে ইউরোপ এখন ব্যয়বহুল এবং অস্থির জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মহাদেশটি তার মোট জ্বালানির অর্ধেকেরও বেশি আমদানি করে, যার বেশিরভাগই তেল ও গ্যাস।
এই নির্ভরশীলতার কারণে সরবরাহে বিঘ্ন বা বৈশ্বিক বাজারে দামের ওঠানামার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যেমন রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলেছে।
গ্যাসের দাম ইউরোপজুড়ে একইভাবে বাড়লেও বিদ্যুতের দাম দেশভেদে ভিন্ন। স্পেনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেশি বিনিয়োগের কারণে বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক কম, অন্যদিকে ইতালিতে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ায় দাম বেশি থাকে।
ফ্রান্স ইউরোপের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদক। দেশটির প্রায় ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে পারমাণবিক উৎস থেকে। এর বিপরীতে জার্মানিতে বিদ্যুতের দাম ফ্রান্সের তুলনায় অনেক বেশি।
২০১১ সালের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর জার্মানি পারমাণবিক শক্তি থেকে সরে আসে। ফলে দেশটির শিল্পখাত গ্যাসনির্ভর হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের বৈশ্বিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে জার্মানির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমে গেছে।
এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক শক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ইতালি নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে, বেলজিয়াম নীতিগত পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে, গ্রিস উন্নত প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে এবং সুইডেন পূর্বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। যুক্তরাজ্যেও নতুন পারমাণবিক প্রকল্প সহজ করতে নিয়ম শিথিল করা হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ পারমাণবিক শক্তিকে কম কার্বন নির্গমনকারী হিসেবে তুলে ধরে বলেন, এটি জ্বালানি স্বনির্ভরতা এবং কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা সেন্টারের বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পারমাণবিক শক্তি তাৎক্ষণিক সমাধান নয়। নতুন রিঅ্যাক্টর নির্মাণে দীর্ঘ সময় লাগে এবং প্রকল্পগুলো প্রায়ই বিলম্বিত হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়েও জনমনে উদ্বেগ রয়েছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, পারমাণবিক শক্তিতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া মধ্য ইউরোপের কিছু দেশ এখনো রাশিয়ার প্রযুক্তি ও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, যা নতুন ঝুঁকি তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান পারমাণবিক অবকাঠামো সচল রাখতে এবং উৎপাদন বাড়াতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইউরোপের অনেক দেশ আর্থিক সংকটে থাকায় এই বিনিয়োগ সহজ নয়।
অন্যদিকে বায়ু ও সৌরশক্তির খরচ কমে যাওয়ায় পারমাণবিক শক্তি অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় কমিশন ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টরের দিকে নজর দিচ্ছে। এগুলো তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং দ্রুত স্থাপনযোগ্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে এ খাতে বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে এবং ২০৩০-এর দশকের শুরুতে এই প্রযুক্তি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
তবে এখনো এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি প্রমাণিত নয়।
সবশেষে বলা যায়, পারমাণবিক শক্তি ইউরোপের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হলেও এটি মূলত মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিকভাবে এর কার্যকারিতা সীমিত।
সূত্র : বিবিসি

