ডিজিটাল বিশ্ব
একটি নির্দেশ বা প্রম্পট লিখেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ছবি তৈরি করে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। শখ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা পেশাগত কাজ, নানা প্রয়োজনে এআই দিয়ে ছবি তৈরির প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু পর্দায় কয়েক মুহূর্তেই তৈরি হওয়া একটি ছবির পেছনে কাজ করছে শক্তিশালী কম্পিউটার, বিপুল বিদ্যুৎ এবং বিশাল ডেটা সেন্টার। আর এসব অবকাঠামোর পরিবেশগত প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পানি ব্যবহার।
এআই মডেল চালাতে ব্যবহৃত সার্ভার ও গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ কাজের সময় প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। এই তাপ নিয়ন্ত্রণে ডেটা সেন্টারে বিভিন্ন ধরনের শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে অনেক ব্যবস্থায় পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে তাপ সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে এআই ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে পানির চাহিদাও যুক্ত হয়ে যায়।
তবে এআই দিয়ে একটি ছবি তৈরি করতে ঠিক কতটুকু পানি লাগে, তার নির্ভরযোগ্য একটি একক সংখ্যা এখনো নেই। কারণ পানির ব্যবহার নির্ভর করে কোন মডেল ব্যবহার করা হচ্ছে, কত শক্তি লাগছে, ডেটা সেন্টার কোথায় অবস্থিত, সেখানে কী ধরনের কুলিং ব্যবস্থা রয়েছে এবং ব্যবহৃত বিদ্যুৎ কী উৎস থেকে আসছে, তার ওপর।
গুগল জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের জেমিনি অ্যাপের একটি মাঝারি বা ‘মিডিয়ান’ টেক্সট প্রম্পট প্রক্রিয়াকরণে প্রায় ০.২৬ মিলিলিটার পানি ব্যবহার হয়েছে, যা প্রায় পাঁচ ফোঁটার সমান। তবে এই হিসাব শুধু টেক্সট প্রম্পটের জন্য। এটিকে এআই দিয়ে একটি ছবি তৈরির পানির খরচ হিসেবে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে না।
এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সামগ্রিক পানি ব্যবহারের মাত্রাও বড় আকার ধারণ করতে পারে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই অবকাঠামোর বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারগুলো বছরে ৭৩১ থেকে ১ হাজার ১২৫ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি ব্যবহার করতে পারে। এই পরিমাণ ৭৩১ থেকে ১ হাজার ১২৫ বিলিয়ন লিটারের সমান।
এখানে শুধু ডেটা সেন্টারের কুলিং ব্যবস্থায় সরাসরি ব্যবহৃত পানি নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত পরোক্ষ পানির ব্যবহারও বিবেচনায় আসে। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাষ্প ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ঠান্ডা করতে পানি প্রয়োজন হয়। ফলে এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাব হিসাবের সময় পানি ব্যবহারের পুরো অবকাঠামোটি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
শুধু পানি নয়, এআই ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে বিপুল বিদ্যুতের চাহিদাও। একই সঙ্গে জিপিইউ, চিপ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি তৈরিতে খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করা হয়। এসব উপকরণ উৎপাদন, পরিবহন, ব্যবহার এবং শেষ পর্যন্ত পরিত্যক্ত হওয়ার প্রতিটি ধাপেরই পরিবেশগত প্রভাব রয়েছে।
তবে একটি এআই ছবি তৈরি মানেই বিপুল পরিমাণ পানি বা পরিবেশের বড় ক্ষতি হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তও সরলীকরণ হবে। একটি নির্দিষ্ট কাজের পানির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য ছবি, লেখা ও ভিডিও তৈরি করলে মোট চাহিদা বড় হয়ে ওঠে। এ কারণেই এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে এর পানি ও জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
পানি ব্যবহারের চাপ কমাতে ডেটা সেন্টারগুলোতে শীতলীকরণ প্রযুক্তিতেও পরিবর্তন আসছে। সরাসরি চিপে তরল শীতলীকরণ বা ‘ডাইরেক্ট-টু-চিপ লিকুইড কুলিং’ পদ্ধতিতে চিপ থেকে সরাসরি তাপ সরিয়ে নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ-চক্রের ব্যবস্থায় একই তরল বারবার ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় নতুন পানির প্রয়োজনও কমে যায়।
এনভিডিয়ার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক তরল শীতলীকরণ এবং ড্রাই কুলারভিত্তিক কিছু ব্যবস্থায় ডেটা সেন্টারের কুলিংয়ে পানির ব্যবহার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানটির নতুন প্রজন্মের কিছু এআই অবকাঠামো সম্পূর্ণ তরল শীতলীকরণ এবং বন্ধ-চক্রের কুলিং ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।
অর্থাৎ, এআই দিয়ে একটি ছবি বানাতে ঠিক কত পানি লাগে, তার উত্তর এক সংখ্যায় দেওয়া এখনো সম্ভব নয়। তবে এআই ব্যবহারের বিস্তার যত বাড়ছে, ততই এর পেছনের ডেটা সেন্টারগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি কম পানি ও কম শক্তি ব্যবহার করে এআই চালানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

