নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পূর্তিতে বিচার দাবি করে নবনির্বাচিত ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের কাছে খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন তার মা রওনক রেহানা। দীর্ঘদিনেও মামলার বিচার শুরু না হওয়ায় তিনি নতুন সংসদের সদস্যদের কাছে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার (১১ মার্চ) সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সংগঠনটি জানায়, এর আগে একই দাবিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছেও খোলা চিঠি দিয়েছিলেন সন্তানহারা এই মা।
বিজ্ঞপ্তিতে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব হালিম আজাদ বলেন, ত্বকী হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। ২০১৪ সালের ৩ জুন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই মামলার কার্যক্রম থমকে যায় বলে অভিযোগ করা হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর জন্ম ১৯৯৫ সালের ৫ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা, গান ও সাহিত্যচর্চায় তিনি ছিলেন মেধাবী ও প্রতিভাবান। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বই পড়ার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল।
ও-লেভেল পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে দেশে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেন ত্বকী। পরে এ-লেভেল পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে বিশ্বে সর্বোচ্চ নম্বর ২৯৭ এবং রসায়নে ২৯৪ নম্বর পান, যা দেশে সর্বোচ্চ ছিল। তবে তার এই ফল প্রকাশের দিনই ত্বকীর মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠে।
চিঠিতে বলা হয়, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের একটি চিহ্নিত পরিবারের সদস্যরা ত্বকীকে হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়। তদন্ত সংস্থা র্যাব ২০১৪ সালের ৫ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।
র্যাবের ওই ব্রিফিংয়ে দাবি করা হয়, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের ১১ জন সদস্য তাদের একটি টর্চারসেলে ত্বকীকে হত্যা করে। কীভাবে, কোথায় এবং কেন এই হত্যা সংঘটিত হয়েছে—তার বিস্তারিত তথ্যও তখন তুলে ধরা হয়েছিল।
তবে অভিযোগ করা হয়, ওই ঘোষণার তিন মাস পর সংসদে দেওয়া বক্তব্যের পর থেকেই ত্বকী হত্যা মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ১৬৪ ধারায় যাদের নাম উঠে আসে, তারা দীর্ঘ সময় ধরে আইনের আওতার বাইরে থেকে শহরে অবাধে চলাফেরা করেছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর নতুন করে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে তারা বর্তমানে উচ্চ আদালতের আদেশে জামিনে রয়েছেন।
এদিকে গত ৬ মার্চ ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় সাড়ে ১১ বছর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছর পার হলেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনও আদালতে জমা পড়েনি।
চিঠিতে রওনক রেহানা সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে লিখেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব একটি পবিত্র দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়, তবে মানুষের হৃদয়ে ক্ষোভ ও বেদনার ক্ষত জমে ওঠে।
তিনি বলেন, একজন মা হিসেবে তার একমাত্র প্রত্যাশা হলো সন্তানের হত্যার বিচার পাওয়া। নতুন সংসদের সদস্যরা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবেন—এমন আশাই ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ জানায়, ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন সংসদের ২৯৭ জন সদস্যের কাছে এই খোলা চিঠি পৌঁছাবে বলে তারা আশা করছে।

