নিজস্ব প্রতিবেদক
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি চলতি বছরের আগস্টে গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩৪ দশমিক ০৮ মিলিয়ন ইউরো, যা গত বছরের আগস্টে ছিল ১১৮ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন ইউরো। তবে বছরের প্রথম আট মাসের হিসাবে রপ্তানি এখনো নিম্নমুখী।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্রকাশিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যের ভিত্তিতে এ চিত্র উঠে এসেছে। আগস্টে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ইইউর সামগ্রিক ডেনিম আমদানি বৃদ্ধির হারকেও ছাড়িয়ে গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বিশ্ববাজার থেকে ইইউর ডেনিম আমদানি ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ বেড়ে ৪৩০ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। এ মাসে ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ বেড়ে ৩১ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। গত বছরের একই মাসে এ হার ছিল প্রায় ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ।
তবে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ইইউতে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমে ৮৬৯ দশমিক ১৩ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯২৩ দশমিক ১১ মিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৫৪ মিলিয়ন ইউরো।
একই সময়ে বিশ্ববাজার থেকে ইইউর ডেনিম আমদানি ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ কমে ২ হাজার ৯৫৬ দশমিক ২১ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। ফলে আট মাসের হিসাবে ইইউর ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা প্রায় ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশে নেমেছে।
রপ্তানি কমলেও ইইউর ডেনিম সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা পাকিস্তানের তুলনায় জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৩৪৪ মিলিয়ন ইউরো বেশি।
ইইউতে পাকিস্তানের ডেনিম রপ্তানি আগস্টে ১৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ বেড়ে ৮৭ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। তবে জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে দেশটির রপ্তানি ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে ৫২৫ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। এ সময়ে ইইউর বাজারে পাকিস্তানের হিস্যা ছিল ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী তুরস্কের রপ্তানিও কমেছে। আগস্টে দেশটির ডেনিম রপ্তানি ১৩ দশমিক ২৬ শতাংশ কমে ৫৮ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়ায়। আর জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে রপ্তানি কমেছে ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ, পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩৮ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ইউরোতে। ইইউর বাজারে তুরস্কের হিস্যা ছিল ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ।
অন্যান্য সরবরাহকারী দেশের মধ্যে জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে তিউনিসিয়ার ডেনিম রপ্তানি ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমে ২১৯ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। কম্বোডিয়ার রপ্তানি ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে ১৪৪ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ইউরো এবং মরক্কোর রপ্তানি ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে ৬৩ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে।
অন্যদিকে, মিশর ও চীন রপ্তানি বৃদ্ধির ধারা বজায় রেখেছে। আগস্টে ইইউতে মিশরের ডেনিম রপ্তানি ৫৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেড়ে ৩০ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে দেশটির রপ্তানি ৩১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে ১৮৮ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। এ সময়ে ইইউর বাজারে মিশরের হিস্যা ছিল ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
চীনের ডেনিম রপ্তানি জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়ে ১৯৭ দশমিক ১৩ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে দেশটির অংশ ছিল ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ছোট সরবরাহকারী ভিয়েতনাম ও ভারতও প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। আট মাসে ভিয়েতনামের রপ্তানি ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়ে ৫৩ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। ভারতের রপ্তানি ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়ে ৩১ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, পোশাক আমদানিতে সামগ্রিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা থাকলেও সুপ্রতিষ্ঠিত সরবরাহব্যবস্থা, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ডেনিম উৎপাদনে শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলেছে। এর ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, শুধু বেশি পরিমাণ পণ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি, স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ালে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। বাংলাদেশে তুলা উৎপাদিত না হলেও কাপড় তৈরির সক্ষমতা ও সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পভিত্তি ডেনিম পণ্যের মান ও মূল্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
ইউরোপের পোশাক বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আমদানি হ্রাস ও জ্বালানিসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের কারণে বিভিন্ন দেশের রপ্তানিকারকেরা চাপে রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রুবেল ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবর্তিত বাণিজ্যবিধি, জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি)-এর শর্ত এবং ‘ইউরোপিয়ান গ্রিন ডিল’-এর আওতায় আসা পরিবেশগত বিষয়গুলোর জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে উচ্চমূল্যের পণ্য, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, উদ্ভাবন ও টেকসই উৎপাদনব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে।

