নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বহুল আলোচিত মামলায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এক দশকের বেশি সময় ধরে তদন্তের পর সংস্থাটি মামলার খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে এবং তা আইনি পরামর্শের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সিআইডির মুখপাত্র জসীমউদ্দিন খান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার খসড়া চার্জশিটে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। চূড়ান্ত আইনি মতামত পাওয়ার পর মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘ অনুসন্ধান ও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের ভিত্তিতে এই খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও চীনের নাগরিকসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পর্যালোচনা করে দায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে নাম থাকা বাংলাদেশি ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা ও মেজবাউল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান এবং উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা। অভিযুক্ত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা ভারতীয় নাগরিক রাকেশ আস্থানার নামও রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা খসড়া অভিযোগপত্র অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে জমা দিয়ে আইনি পরামর্শ চেয়েছেন। বর্তমানে নথিপত্র যাচাই-বাছাই করছে ওই কার্যালয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইনি মতামতের ভিত্তিতেই চার্জশিট চূড়ান্ত করে আদালতে দাখিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সরিয়ে নেয়। এর মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের চারটি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। বাকি ২০ মিলিয়ন ডলার শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকে পাঠানোর চেষ্টা হলেও বানানজনিত ভুলের কারণে সেই লেনদেন সম্পন্ন হয়নি।
ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ফিলিপাইন থেকে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। পরে ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন উপপরিচালক (হিসাব ও বাজেটিং) জোবায়ের বিন হুদা মতিঝিল থানায় মামলাটি দায়ের করেন। এরপর থেকে মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডি।
এদিকে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ জানিয়েছিলেন, ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকে থাকা চুরি হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ চলছে।
এক দশক পর তদন্তের এই অগ্রগতি রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দায় নির্ধারণ ও বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন অ্যাটর্নি জেনারেলের আইনি মতামত এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের দিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।


