নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন বেইজিং সফরে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় দলিল সই হতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পর একটি যৌথ ইশতেহার ঘোষণার প্রস্তুতিও চলছে। কূটনৈতিক মহলে এটি ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শনিবার (২০ জুন) সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, চীন সফরের আলোচ্যসূচিতে উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। সম্ভাব্য দলিলগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা (অ্যাকশন প্ল্যান) এবং একটি প্রটোকল। তাঁর ভাষ্য, তিস্তা প্রকল্পসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। রোববার মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে তাঁর এ সফর শুরু হবে। এরপর কুয়ালালামপুর থেকে তিনি চীনের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। সরকার এই সফরকে কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে দেখছে না; বরং অর্থনৈতিক কূটনীতি পুনর্গঠন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পর দুই দেশ একটি যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে। ঢাকা ও বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এটি হবে তৃতীয় যৌথ ইশতেহার। এর আগে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর এবং ২০০৫ সালে সম্পর্কের তিন দশক পূর্তি উপলক্ষে দুই দেশ এমন ঘোষণা দিয়েছিল। ফলে সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তির প্রেক্ষাপটে নতুন এই ইশতেহারকে দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের সফরের তাৎপর্য শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক সংলাপ, কৌশলগত বোঝাপড়া এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অংশীদারত্বের বিষয়গুলোও আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে। বিশেষ করে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে পৃথক বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক গুরুত্বকে নতুনভাবে সামনে আনছে।

সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী প্রথমে চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সম্মেলন বা ‘সামার ডাভোস’-এ অংশ নেবেন। ২৩ থেকে ২৫ জুন অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ৭০০ প্রতিনিধি অংশ নেবেন। ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এবারের সম্মেলনে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শিল্পায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হবে।

দালিয়ানে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেবেন। পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি বেইজিংয়ে যাবেন, যেখানে দ্বিপক্ষীয় সফরের মূল কর্মসূচিগুলো অনুষ্ঠিত হবে।

বেইজিং পর্বে ২৫ জুন বাংলাদেশ বিনিয়োগ ফোরামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। চীনের কয়েকটি শীর্ষ শিল্প ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। এ ছাড়া চীনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা (সিডকা), এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়না এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন তিনি।

একই দিন গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনার পর দুই নেতার উপস্থিতিতে চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও প্রটোকল সই হওয়ার কথা রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, সইয়ের জন্য চূড়ান্ত হওয়া দলিলগুলোর সংখ্যা ১৫-এর বেশি।

সইয়ের জন্য প্রস্তুত দলিলগুলোর মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সংস্কার, চীনা ভাষা শিক্ষা, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদন, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ, কারিগরি শিক্ষা এবং গণমাধ্যম সহযোগিতা। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা, সম্প্রচারমাধ্যম এবং তথ্য খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।

এ ছাড়া চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ-জিডিআই)-এ বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততার পথও এ সফরে উন্মুক্ত হতে পারে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় এক দশক পর চীনের কোনো বড় বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা ঘটবে। এর আগে ২০১৬ সালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদলের আকার তুলনামূলকভাবে সীমিত রাখা হয়েছে। মালয়েশিয়া সফরে ২৭ জন এবং চীন সফরে ২৮ সদস্যের প্রতিনিধিদল থাকবে। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি সফরকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ রাখাই সরকারের লক্ষ্য।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন এক সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখাও সমান প্রয়োজনীয়।

তাদের পর্যবেক্ষণ, প্রস্তাবিত চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছালে এবং যৌথ ইশতেহারে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সুস্পষ্ট রূপরেখা উঠে এলে এবারের সফর ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে শুধু প্রকল্পনির্ভর সহযোগিতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখবে না; বরং আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের ভিত্তি গড়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।

Share.
Exit mobile version