নিজস্ব সংবাদদাতা
বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পাওয়া নতুন সরকার আগামী পাঁচ বছরে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সরকারের অগ্রাধিকার। প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য এবং শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও তুলে ধরেন তিনি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। ‘কৃষক কার্ড’ কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে। ‘হেলথ কার্ড’-এর মাধ্যমে সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং পরবর্তী সময়ে ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’-এর মাধ্যমে সমন্বিত সরকারি সেবা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন এবং তারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেবেন।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করার মাধ্যম হতে হবে। আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ এবং সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের কথাও জানান তিনি।
প্রথম শ্রেণি থেকেই বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, দুপুরের খাবার ও বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধিও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন ও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে হবে। ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও নতুন উদ্যোগে সহায়তার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি উল্লেখ করে প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ আরও সহজ করার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
পানি নিরাপত্তার বিষয়ে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানার মধ্যে ৫৩টি এখন বাংলাদেশে রয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদারের পাশাপাশি মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আইনের শাসন প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়নের পাশাপাশি সংকটের মূল কারণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে। শান্তি ও সম্প্রীতিকে যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
৩ থেকে ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এবারের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ বক্তা, ৩০০-এর বেশি প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিচ্ছেন। সম্মেলনে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ ও মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।

