নিজস্ব সংবাদদাতা
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, অনলাইন জগৎ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল গার্ল চাইল্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এনজিসিএএফ) যৌথভাবে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন।
বক্তব্যে কন্যাশিশুর কল্যাণে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে এবং তাদের স্বপ্নপূরণের পথ তৈরি করে দিতে হবে। এ দায়িত্ব পালনে পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা, চিকিৎসা, খেলাধুলা, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা যোগ্যতা ও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছেন। বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের আন্তর্জাতিক সাফল্য এবং নিশাত মজুমদারের এভারেস্ট জয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি এসব অর্জনকে দেশের জন্য গর্বের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন।
অভিভাবকদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, কন্যাশিশুকে বোঝা নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে হবে। ছেলে ও মেয়েকে সমান মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের সম্মান করতে শেখাতে হবে। মেয়েদের বিয়ের জন্য সঞ্চয়ের আগে তাদের শিক্ষা ও কল্যাণে বিনিয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, কন্যাশিশুর জন্ম কোনো বোঝা নয়, বরং অফুরন্ত সম্ভাবনার সূচনা। তার শিক্ষা কোনো দয়া নয়, এটি মৌলিক অধিকার। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দুই কন্যার পিতা হিসেবে প্রতিটি কন্যাশিশুর মধ্যে নিজের সন্তানদের মুখ দেখতে পান উল্লেখ করে তিনি বলেন, কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা তাঁর কাছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের পাশাপাশি গভীর মমতার বিষয়।
কন্যাশিশুর প্রতি সম্মান ও দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তুলতে ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, সব ধর্মের নৈতিক শিক্ষায় নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবে সমাজে অনেক সময় কন্যাসন্তানকে অবমূল্যায়ন ও অবহেলার শিকার হতে হয়।
এ বছরের আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাল্যবিয়ে কেবল একটি বিয়ের ঘটনা নয়, এর ফলে কন্যাশিশুর শৈশব থেমে যায়, শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয় এবং সম্ভাবনার অপচয় ঘটে। এর সঙ্গে অকাল মাতৃত্ব, স্বাস্থ্যঝুঁকি, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা ও সহিংসতার আশঙ্কাও যুক্ত হতে পারে।
কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতন ও নিপীড়ন প্রতিরোধে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলায় কিশোরীবান্ধব সেবা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করা এবং হেল্পলাইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
কন্যাশিশুদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে, শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে, দক্ষতা অর্জন করতে হবে এবং স্বাবলম্বী হওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যায়, নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার হলে বিশ্বস্ত অভিভাবক, শিক্ষক কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে মার্শাল আর্ট শেখার প্রতিও উৎসাহ দেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, কন্যাশিশুর বিশ্বজয়ের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং সর্বোপরি মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। নারী ও কন্যাশিশুকে পিছিয়ে রেখে কোনো সমাজ বা জাতি এগিয়ে যেতে পারে না উল্লেখ করে তিনি নিরাপদে জন্ম নেওয়া, নির্ভয়ে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা গ্রহণ ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
নারীশিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথাও স্মরণ করেন তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, নারীদের শিক্ষা বৃত্তি ও বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। নারীর নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি এ ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রশান্ত ত্রিপুরা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রওশন আরা বেগম এবং এনজিসিএএফের সহ-সভাপতি শাহীন আক্তার ডলি। এর আগে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শায়লা শারমিন জামান স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয় এবং দুই কন্যাশিশু নিজেদের মতামত তুলে ধরে।

