বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা জহির রায়হানের ‘সংগম’ ও ‘বাহানা’ মুক্তির ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের সংগ্রহে নেই। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, চলচ্চিত্র দুটির অ্যানালগ কিংবা ডিজিটাল কোনো সংস্করণই বর্তমানে তাদের সংরক্ষণে নেই।
১৯৬৪ সালের ২৩ এপ্রিল মুক্তি পায় জহির রায়হান পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘সংগম’। লিটল সিনে সার্কেলের প্রযোজনায় নির্মিত ছবিটিকে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে অভিনয় করেন রোজী, হারুন, সুমিতা, খলিলসহ অনেকে। মুক্তির পর ছবিটি পূর্ব পাকিস্তানের পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানেও দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলে।
এর এক বছর পর ১৯৬৫ সালের ১৩ এপ্রিল মুক্তি পায় জহির রায়হানের আরেক উর্দু চলচ্চিত্র ‘বাহানা’। এটিও লিটল সিনে সার্কেলের প্রযোজনায় নির্মিত। ছবিতে অভিনয় করেন রহমান, কবরী, জাকারিয়াসহ অনেকে। চলচ্চিত্রটিকে পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৮ সালে চলচ্চিত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন পুরোনো ও দুষ্প্রাপ্য চলচ্চিত্র সংগ্রহের পাশাপাশি সেগুলো ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের কাজ করে আসছে। জহির রায়হানের বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রও আর্কাইভের সংগ্রহে রয়েছে।
আর্কাইভে সংরক্ষিত জহির রায়হানের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘কখনো আসেনি’, ‘বেহুলা’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘আনোয়ারা’, ‘মনের মতো বউ’-এর আংশিক অংশ, ‘জীবন থেকে নেয়া’ এবং ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর আংশিক অংশ। তবে ‘সংগম’ ও ‘বাহানা’ সেখানে সংরক্ষিত নেই।
বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের পরিচালক ফারহানা রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চলচ্চিত্র জমা দিলে সেটি ডিজিটাল রূপান্তরের পর আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হয়। কোনো চলচ্চিত্রের কপি আর্কাইভে না থাকলে ধরে নেওয়া হয়, স্বত্বাধিকারী পক্ষ সেটি জমা দেয়নি। পাশাপাশি পুরোনো চলচ্চিত্র উদ্ধারের উদ্যোগও নেওয়া হয়।
আর্কাইভের সাবেক কর্মকর্তা ফখরুল আলম জানিয়েছেন, ‘সংগম’ ও ‘বাহানা’ উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করা হলেও তাদের হাতে চলচ্চিত্র দুটির কোনো কপি আসেনি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সময়ের সঙ্গে ছবিগুলোর মূল প্রিন্ট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেগুলো উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে না থাকলেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ‘সংগম’-এর একটি সংস্করণের সন্ধান একসময় পাওয়া গিয়েছিল। চলচ্চিত্র গবেষক মীর শামছুল আলমের কাছে ছবিটির একটি ডিজিটাল সংস্করণ সংরক্ষিত থাকার কথা জানা গেছে। তিনি জানান, অভিনেতা হারুন পাকিস্তান থেকে একটি ভিএইচএস ক্যাসেট নিয়ে এসেছিলেন, যা পরে ডিজিটাল রূপ দেওয়া হয়।
জহির রায়হানের ছেলে অনল রায়হানও জানিয়েছেন, পরিবারের কাছে ‘বাহানা’র কোনো কপি নেই। ‘সংগম’-এর একটি ভিএইচএস ক্যাসেট একসময় পরিবারের কাছে থাকলেও পরে সেটির আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
‘সংগম’ ও ‘বাহানা’র পাশাপাশি জহির রায়হানের ‘সোনার কাজল’ চলচ্চিত্রটিও বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের সংগ্রহে নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রের একটি অংশ সংরক্ষণের বাইরে থেকে যাওয়ায় দেশের চলচ্চিত্র ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

