এক দশকের মধ্যে দ্বিগুণ বেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন বা ৪০ লাখ কোটি ডলারের ঐতিহাসিক মাইলফলক অতিক্রম করেছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশটির মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ০৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। ২০১৬ সালে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ২০ ট্রিলিয়ন ডলারেরও কম।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে ট্রাম্প ও বাইডেন প্রশাসনের সময়ে বড় ধরনের সরকারি ব্যয় অব্যাহত থাকায় দেশটির ঋণের বোঝা আরও বাড়ে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও) এর আগে পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৬ অর্থবছর শেষে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৩৯ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু প্রত্যাশার আগেই ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের ব্যয় এবং সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সিবিও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ৪১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩৬ সালের মধ্যে দেশটির জাতীয় ঋণ প্রায় ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের এই দ্রুত বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারেও প্রভাব ফেলেছে। গত মঙ্গলবার ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন বন্ডের সুদের হার বেড়ে ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়ায়, যা প্রায় ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই বন্ডের সুদের হারের সঙ্গে গৃহঋণ, গাড়ি ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও সম্পর্কিত।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি খাতে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল ঋণ গ্রহণও বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।
সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ডেভিড জ্যাকস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং একসময় এই ঋণ পরিশোধ করতেই হবে। ঋণ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হলে ২০০৮ সালের মতো বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রেজারি বিভাগ আগামী ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত বন্ড বাইব্যাক কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। কর্মসূচির আওতায় বন্ড পুনরায় কেনার পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৪ বিলিয়ন ডলার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদের হার কিছুটা কমে ৫ দশমিক ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান বিশ্লেষক জন ক্যানাভান মনে করেন, এই পদক্ষেপ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। তবে ট্রেজারির ঋণের বিশাল আকারের তুলনায় এটি দীর্ঘমেয়াদে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না।
জার্মানির ডিজে ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক রেনে আলব্রেখট বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র তিন মাস বাকি থাকায় সুদের হার নিয়ন্ত্রণে ট্রেজারি বিভাগকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ মোহামেদ এ এল-ইরিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্ক করে বলেছেন, সুদের হার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সাময়িক পদক্ষেপের অপ্রত্যাশিত নেতিবাচক প্রভাব ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত ১২৫ দশমিক ৮ শতাংশ। একই অনুপাত যুক্তরাজ্যে ১০৩ দশমিক ৬ শতাংশ, চীনে ১০৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং জাপানে ২০০ শতাংশেরও বেশি।

