গত ২৪ জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি বাহিনীর লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে র্যাবের নেতৃত্বে সারাদেশে বিশেষ অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন র্যাব মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুরস্কার ঘোষণা করেছেন বলেও জানান তিনি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় র্যাব-৬ খুলনা সদর দপ্তরে সুন্দরবনের জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ ও অস্ত্র উদ্ধার উপলক্ষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
র্যাব মহাপরিচালক বলেন, গত ২৪ জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় পুলিশসহ সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর যে অস্ত্র লুট হয়েছে, সেগুলো উদ্ধারের দায়িত্ব র্যাবকে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সারাদেশে র্যাবের নেতৃত্বে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
তিনি জানান, অভিযানের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।
অভিযানে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান র্যাব মহাপরিচালক। তিনি বলেন, তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে।
এদিকে র্যাব জানায়, গত সোমবার সুন্দরবনের পাঁচটি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ জন সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। পরে একই রাতে আরও সাতজন আত্মসমর্পণ করেন। এ নিয়ে আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৯ জনে।
আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনারুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন, আফতাব বাহিনীর আটজন এবং মিজান বাহিনীর সাতজন রয়েছেন।
এ সময় তাদের কাছ থেকে চারটি শটগান, ৪৭টি ওয়ান শুটারগান, চারটি পাইপগান, তিনটি এয়ারগান, একটি .২২ বোর রাইফেল, সাতটি ওয়াকিটকি, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি ও ১৪টি খালি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে র্যাব মহাপরিচালক বলেন, সুন্দরবন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের প্রায় ২৫ লাখ মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। আশির দশক থেকে সুন্দরবন ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যুতা ও বনদস্যুতার কারণে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষকে জিম্মি, নির্যাতন ও চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩১৮ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন।
তিনি বলেন, সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক কারণ, সচেতনতার অভাব, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অনীহা এবং হয়রানির ভয়—এসব কারণে কেউ কেউ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। তবে ৩১৮ জনের মধ্যে প্রায় ৩০ জনের অপরাধে ফিরে যাওয়া বড় কোনো বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
র্যাব মহাপরিচালক জানান, সুন্দরবনে এখনও চার-পাঁচটি জলদস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীর সদস্যদেরও অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। আত্মসমর্পণকারীদের জন্য নেওয়া পুনর্বাসন প্যাকেজ দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হবে বলে আশা করেন তিনি।
আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসনে আগের চেয়ে আরও ভালো ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি আত্মসমর্পণকারীরা যাতে অহেতুক মামলা ও হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
র্যাব মহাপরিচালক বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ ছাড়া কাউকে আটক কিংবা মামলা দেওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে আত্মসমর্পণকারীরা যাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করা হয়েছে।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা জোরদারে সেখানে একটি র্যাব ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান তিনি। বর্তমানে সুন্দরবন এলাকায় কোস্টগার্ডের একটি ক্যাম্প রয়েছে। সুন্দরবনবাসী চাইলে সেখানে র্যাবের একটি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করতে পারেন বলেও জানান তিনি।
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে বলে জানান র্যাব মহাপরিচালক।

