বিনোদন ডেস্ক
একসময় ইংল্যান্ডের রানি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তাঁর সামনে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় জাদুবিদ্যা, ধর্মদ্রোহিতা ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে। পঞ্চদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের অভিজাত নারী এলিনর কোবহ্যামের বিচার ইতিহাসে এক আলোচিত ঘটনা। তিনি কি সত্যিই ক্ষমতার জন্য জাদুবিদ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন, নাকি রাজনীতির জটিল খেলায় তাঁকে বলির পাঁঠা করা হয়েছিল? লেখক ফিলিপা গ্রেগরির নতুন উপন্যাস রয়্যাল উইচ ঘিরে সেই পুরোনো বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে।
১৪৪১ সালে এলিনর কোবহ্যামের বিরুদ্ধে জাদুবিদ্যা ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ ওঠে। তিনি ছিলেন হামফ্রে অব ল্যাঙ্কাস্টারের স্ত্রী, যিনি ডিউক অব গ্লস্টার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ হেনরির কোনো সন্তান না থাকায় হামফ্রের ভবিষ্যৎ রাজা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ফলে রাজপরিবারের উত্তরাধিকার ও ক্ষমতার রাজনীতিতে এলিনরের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এলিনরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আবার কেউ মনে করেন, সে সময়ের তদন্তে এমন কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, যা কর্তৃপক্ষকে জাদুবিদ্যার অভিযোগে বিচার এগিয়ে নিতে উৎসাহিত করে।
ফিলিপা গ্রেগরির রয়্যাল উইচ উপন্যাসে এলিনরের জীবন ও বিচারকে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে লেখা উপন্যাসটিতে ক্ষমতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এলিনরকে ঘিরে প্রচলিত ধারণার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আলোচনায় এসেছে।
এলিনরের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল মৃত ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা, জ্যোতিষশাস্ত্রের সাহায্যে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এবং রাজার মোমের প্রতিকৃতি তৈরি করে তাঁর ক্ষতি করার পরিকল্পনা। এ ছাড়া প্রেম ও সন্তান ধারণে সহায়তার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ওষুধ বা মিশ্রণ ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছিল।
এই ঘটনায় এলিনরের পাশাপাশি রজার বলিংব্রোক ও মার্জারি জারডেমেইনের নামও সামনে আসে। বলিংব্রোককে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং পরে তাঁর দেহের অঙ্গচ্ছেদ করা হয়। মার্জারি জারডেমেইনকে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এলিনরকে জনসমক্ষে তিন দিন ধরে প্রায়শ্চিত্ত করতে বাধ্য করা হয়। পরে তাঁকে কারাবন্দি করা হয় এবং বাকি জীবন বন্দিদশায় কাটাতে হয়।
এলিনরের বিচারকে ঘিরে বিতর্কের একটি বড় দিক হলো, সে সময় নারীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কীভাবে দেখা হতো। ক্ষমতাবান কোনো নারীর বিরুদ্ধে জাদুবিদ্যার অভিযোগ তাঁর সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারত। তবে এলিনরের ক্ষেত্রে অভিযোগগুলো কতটা প্রমাণভিত্তিক ছিল, আর কতটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে একক মত নেই।
ইতিহাসবিদ ইউয়ান রজারের মতে, এলিনরের বিরুদ্ধে অভিযোগের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করে থাকতে পারে। অন্যদিকে গ্রেগরি মনে করেন, ঘটনাটিতে এমন কিছু প্রমাণের উল্লেখ রয়েছে, যা পুরো বিচারকে কেবল সাজানো ষড়যন্ত্র বলে ব্যাখ্যা করাকে জটিল করে তোলে। ফলে এলিনরের ঘটনা ইতিহাস, রাজনীতি ও লোকবিশ্বাসের সংযোগস্থলে এক বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে।
এলিনরের পতন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি ছিল না; এর প্রভাব পড়েছিল তৎকালীন ইংল্যান্ডের ক্ষমতার ভারসাম্যেও। ল্যাঙ্কাস্টার রাজবংশের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার পটভূমিতে পরবর্তী সময়ে ইয়র্ক ও ল্যাঙ্কাস্টার পরিবারের দ্বন্দ্ব আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই দীর্ঘ সংঘাতই ইতিহাসে ‘গোলাপের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।
রয়্যাল উইচ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে এলিনর কোবহ্যামের কাহিনি আবারও আলোচনায় এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কতটা সত্য ছিল, তা নিয়ে বিতর্কের চূড়ান্ত মীমাংসা না হলেও ঘটনাটি মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে ক্ষমতা, লিঙ্গবৈষম্য ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

