ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপির চেয়ারপার্সন তারেক রহমান দলীয় নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শিরোনামের এ নির্বাচনি ইশতেহারে নয়টি গুচ্ছভিত্তিক প্রধান প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হয়। তন্মধ্যে একটি অন্যতম প্রতিশ্রুতি হলো ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মস্তিষ্কপ্রসূত এ নির্বাচনি অঙ্গীকার তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতারই প্রতিফলন। এটি নিছক কোনো নির্বাচনি ওয়াদা নয়, বরং এটি মানবিকতা ও উন্নয়ন ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। এটি বিএনপির প্রতিশ্রুত ইনসাফভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার এক বিচক্ষণ ও সাহসী পদক্ষেপ।
বর্তমানে দেশে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা ও প্যাগোডার নিরেট কোনো তথ্য নেই। প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলমান। তবে বিভিন্ন সূত্রে যে ধারণা পাওয়া যায়, সেটা প্রায় চার লক্ষের কাছাকাছি। আমাদের দেশের মতো এরূপ অর্থনৈতিক পরিকাঠামোয় দাঁড়িয়ে এই বিশাল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত ব্যক্তিদেরকে মাসিক সম্মানী ভাতার আওতায় আনার চিন্তাকে দুঃসাহস হিসেবে অভিহিত করাটা কোনোভাবেই অত্যুক্তি হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই সাহস দেখিয়েছেন। তিনি সমাজের একটি বিরাট অংশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছেন।
মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে যারা দায়িত্ব পালন করেন, তারা নিতান্তই ধর্মীয় দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে, মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভের জন্যই এই দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে আমাদের প্রান্তিক জনপদে এমন অনেক মসজিদ আছে, যেসব মসজিদের নিয়মিত কোনো আয়ের উৎস নেই। মসজিদের মুসল্লীগণ যা দান করেন, সেটার ওপর নির্ভর করেই মসজিদের পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো মসজিদে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ ন্যূনতম কিছু মাসিক সম্মানী পান, আবার কোনো কোনো মসজিদে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি একেবারেই অবৈতনিক। অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের চিত্রও অভিন্ন। এসব ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ চাহিদার লাগাম টেনে কোনোরকমে দিনাতিপাত করেন। নাগরিক হিসেবে তাদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। এ নিরিখে এই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের রাষ্ট্রনায়কোচিত ভাবনারই প্রতিফলন।
আমাদের দেশে সাধারণত নির্বাচনি ওয়াদাসমূহ অনেকটা প্রথাগত এবং তা কাগজে-কলমেই আটকে থাকে। অধিকাংশই বাস্তবতার আলো দেখে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার এক মাস না পেরোতেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের শুভ সূচনা করেছেন। ইতোমধ্যে কৃষকদের সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে এবং দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধন করা হয়েছে। গত ১৪ মার্চ উদ্বোধন করা হয়েছে মসজিদ, মন্দির ও বৌদ্ধ বিহারে কর্মরতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মাসিক সম্মানী প্রদান কার্যক্রম। এত দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ।
প্রথম পর্যায়ে একটি পাইলট স্কিমের আওতায় ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের মাসিক সম্মানী চালু করা হয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় প্রাথমিকভাবে প্রতিটি ইউনিয়ন ও প্রতিটি পৌরসভা হতে একটি করে মোট ৪,৯০৮টি মসজিদ, প্রতিটি উপজেলা হতে দুটি করে মোট ৯৯০টি মন্দির, বৌদ্ধবিহার রয়েছে এমন ৭২টি উপজেলার প্রতিটি হতে দুটি করে মোট ১৪৪টি বৌদ্ধবিহার নির্বাচন করা হয়েছে। মসজিদের ক্ষেত্রে মাসিক সম্মানী হিসেবে ইমামকে ৫,০০০ টাকা, মুয়াজ্জিনকে ৩,০০০ টাকা ও খাদেমকে ২,০০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। মন্দিরের ক্ষেত্রে পুরোহিতকে ৫,০০০ টাকা ও সেবাইতকে ৩,০০০ টাকা এবং বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষকে ৫,০০০ টাকা ও পুরোহিতকে ৩,০০০ টাকা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, প্রতিবছর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদেরকে ১,০০০ টাকা করে এবং দুর্গাপূজা, বৌদ্ধ পূর্ণিমা ও বড়দিনে সংশ্লিষ্ট পুরোহিত, সেবাইত, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদেরকে ২,০০০ টাকা করে উৎসব ভাতা প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতার টাকা ইএফটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের সোনালী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে।
আগামী চার অর্থবছরে মোট চারটি ধাপে দেশের সকল মসজিদ, মন্দির ও বৌদ্ধবিহারে কর্মরত ব্যক্তিদেরকে মাসিক সম্মানীর আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এক-চতুর্থাংশ, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে দুই-চতুর্থাংশ, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তিন-চতুর্থাংশ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে শতভাগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এ মাসিক সম্মানীর আওতায় আসবে। এজন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ১,১০০ কোটি টাকা, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রায় ২,২০০ কোটি টাকা, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে প্রায় ৩,৩০০ কোটি টাকা এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে প্রায় ৪,৪০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সার্বিক কল্যাণে আরও কতিপয় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্থায়ীভাবে মাসিক সম্মানী প্রদানের লক্ষ্যে একটি নীতিমালা প্রণয়নে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের দক্ষতা শানিত করার লক্ষ্যে দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খণ্ডকালীন বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, তাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যেও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং মসজিদে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি বিধিমালা বা নীতিমালা প্রণয়নের জন্য ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা ধর্মীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের পাশাপাশি দেশ ও জাতির উন্নয়নে, বিশেষ করে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে জনসাধারণকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও তাঁদের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁরা মাদকের অপব্যবহার রোধ, নারী নির্যাতন ও যৌতুক প্রতিরোধ, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল রোধ, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ, সুদ, ঘুষ ও দুর্নীতি প্রতিরোধসহ জাতির যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে সম্মুখযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে থাকেন। করোনার সময় যখন পুত্র পিতার লাশ ছুঁতে ভয় পেয়েছে, স্ত্রী তার স্বামীর লাশ রেখে পালিয়ে গেছে, সেই দুর্যোগময় সময়ে আমাদের ধর্মীয় নেতারা এগিয়ে এসেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃতদেহ সৎকার করেছেন। তাঁদের এ ভূমিকা দেশ ও জাতিকে দুর্যোগ মোকাবিলায় সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছে। তাঁরা আমাদের সমাজে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের এই শক্তিকে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে কাজে লাগানো সম্ভব হলে দেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ হবে।
আমাদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা আছে, এটা সত্য। তবে আমাদের মানসিক দীনতাও কিন্তু কম নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই মানসিক দীনতাকে পরাভূত করে সীমিত সামর্থ্য দিয়েই দেশের বৃহৎ একটি শ্রেণির পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন। তিনি মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের নেতৃবৃন্দকে মাসিক সম্মানী প্রদানের বিষয়টি নির্বাচনি ইশতেহারে সন্নিবেশ করেছেন। কোনো আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং বিবেকতাড়িত হয়েই এই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এদেশে আবহমানকাল থেকে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও সম্প্রদায়ের মানুষ অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে আসছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের ঐক্য ও শক্তির প্রতীক। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানী প্রদানের এই উদ্যোগ আবহমান বাংলার সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরই প্রতিবিম্ব। সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ এই নীতি লালন করে থাকে। সকল ধর্মের উপাসনালয়ে কর্মরতদের মাসিক সম্মানী প্রদান সরকারের সেই নীতির প্রতিফলন।
মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের নেতৃবৃন্দকে মাসিক সম্মানী দেওয়ার এই উদ্যোগ একদিকে যেমন মহৎ, অন্যদিকে এটি উত্তম বিনিয়োগও বটে। এই উদ্যোগ আমাদের অর্থনীতিতে বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানব উন্নয়ন তথা সামগ্রিক উন্নয়ন সূচকে দেশ এগিয়ে যাবে। এ কার্যক্রম দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।

