আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বজুড়ে তীব্র দাবদাহ এখন আগের চেয়ে বেশি বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। মাসের পর মাস, কখনো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এসব দাবদাহ মানুষের জীবন, কৃষি, বনভূমি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। কোথাও প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা, কোথাও দাবানলে পুড়ছে বন, আবার কোথাও খরা ও পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এসব দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে ‘হিট স্টর্ম’ বা ‘তীব্র দাবদাহ’ ধারণাটি ব্যবহার করা হয়েছে।
২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী একটি তীব্র দাবদাহের বিস্তৃতি একপর্যায়ে পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকায় পৌঁছেছিল। ৩৬৭ দিন স্থায়ী এই দাবদাহ এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব ফেলেছিল। এর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল ভয়াবহ দাবানল, প্রাণঘাতী গরম, খরা এবং অতিবৃষ্টিজনিত বিপর্যয়।
এই চিত্র তুলে ধরতে ১৯৬০ সাল থেকে বিশ্বের ১০ লাখের বেশি ভৌগোলিক এলাকার প্রতি ঘণ্টার তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু ও আবহাওয়াবিষয়ক দুই ডজন গবেষক ও বিজ্ঞানীর মতামত নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কয়েক দশক আগেও যে ধরনের বিস্তৃত তাপপ্রবাহ ছিল বিরল, এখন সেগুলো আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং বড় এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
ছয় দশকে বদলে গেছে তাপপ্রবাহের চিত্র
হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশকে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচটি তীব্র দাবদাহ সক্রিয় থাকত। চলতি দশকে সেই সংখ্যা বেড়ে গড়ে প্রায় ১০২টিতে দাঁড়িয়েছে। শুধু সংখ্যাই নয়, এসব দাবদাহের বিস্তৃতি ও স্থায়িত্বও বেড়েছে।
১৯৬০-এর দশকে সবচেয়ে বড় তাপপ্রবাহটি আটলান্টিক মহাসাগর, লাতিন আমেরিকার কিছু অংশ ও পশ্চিম আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি স্থায়ী হয়েছিল ৪৬ দিন এবং পৃথিবীর মোট এলাকার প্রায় ৬ শতাংশকে প্রভাবিত করেছিল। অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ সালের দাবদাহটি ৩৬৭ দিন সক্রিয় ছিল এবং সর্বোচ্চ বিস্তারের সময় পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকাকে প্রভাবিত করেছিল।
তাপপ্রবাহ ও তীব্র দাবদাহের মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে একটি বিশেষ বিশ্লেষণী মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি তাপমাত্রা টানা পাঁচ দিন বা তার বেশি স্থায়ী হলে সেটিকে তাপপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়েছে। আর কোনো তাপপ্রবাহ সর্বোচ্চ বিস্তারের সময় পৃথিবীর অন্তত ১ শতাংশ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে ‘হিট স্টর্ম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পৃথিবীর মোট এলাকার ১ শতাংশের আয়তন প্রায় কানাডার অর্ধেকের সমান।
তবে এটি একটি বিশেষ বিশ্লেষণে ব্যবহৃত সংজ্ঞা। তাপপ্রবাহ নির্ধারণে বিশ্বজুড়ে এখনো একক কোনো সর্বজনস্বীকৃত মানদণ্ড নেই। বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া সংস্থা তাপমাত্রা ও স্থায়িত্বের ভিন্ন ভিন্ন হিসাব ব্যবহার করে।
এক দাবদাহে বিভিন্ন অঞ্চলে বিপর্যয়
২০২৩-২৪ সালের রেকর্ড সৃষ্টিকারী দাবদাহের সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী গরমের বহুমুখী প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ফিলিপাইনে প্রচণ্ড গরমে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া পরিচালিত স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাজধানী ম্যানিলার এক শিক্ষক জানান, শ্রেণিকক্ষে এক শিক্ষার্থীর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করেছিল। তীব্র গরমে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা এতটাই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছিল যে, স্কুলগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রস্তুতিও নিতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যেও তীব্র গরম ও খরার প্রভাব দেখা যায়। ২০২৩ সালের আগস্টে সেখানে প্রায় ৬০০টি দাবানলের ঘটনা ঘটে। জলাভূমিতে জ্বলতে থাকা আগুনের ধোঁয়া থেকে পরে মহাসড়কে ঘন ধোঁয়াশা তৈরি হয়। এতে অন্তত ১৫৮টি গাড়ি দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে এবং সাতজন নিহত হন।
লিবিয়ার দেরনা শহরেও ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে। ২০২৩ সালে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট একটি ঝড়ের কারণে সেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। শহরটির কাছে দুটি বাঁধ ভেঙে গেলে পানির প্রবল স্রোতে পুরো আবাসিক এলাকা ভেসে যায়। এই বিপর্যয়ের পেছনে একাধিক কারণ থাকলেও ঘটনাটি চরম আবহাওয়াজনিত ঝুঁকির ভয়াবহতা সামনে আনে।
সৌদি আরবে ২০২৪ সালের হজের সময় মক্কার তাপমাত্রা ৫১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। তীব্র গরমে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি হজযাত্রীর মৃত্যুর খবরও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৩ সালে গ্রিসে ভয়াবহ দাবানলে বিস্তীর্ণ বনভূমি পুড়ে যায়। ইউরোপে নথিভুক্ত বৃহত্তম দাবানলগুলোর একটি ছিল সেটি।
ঘটনাগুলো বিভিন্ন দেশে এবং ভিন্ন পরিস্থিতিতে ঘটলেও এগুলো চরম তাপ ও অন্যান্য আবহাওয়াগত ঝুঁকির পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে প্রতিটি দুর্যোগের কারণ এক নয়। স্থানীয় আবহাওয়া, ভূমির ধরন, অবকাঠামো এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
তীব্র দাবদাহের বিস্তার বৃদ্ধির সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার যোগসূত্র পাওয়া গেছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোসহ বিভিন্ন মানব কর্মকাণ্ডের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে। এতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং চরম গরমের ঝুঁকিও বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশক থেকে চলতি দশক পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে তাপপ্রবাহ ও তীব্র দাবদাহের আওতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে, পৃথিবীর এমন এলাকার গড় পরিমাণ ১২ গুণেরও বেশি বেড়েছে।
এল নিনোও কোনো কোনো সময়ে তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যায়। এর ফলে কিছু এলাকায় গরম ও খরা বাড়তে পারে।
তবে সব তীব্র দাবদাহের পেছনে একই কারণ কাজ করে না। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের অবস্থা এবং আঞ্চলিক আবহাওয়ার ধরনও এসব ঘটনার তীব্রতা ও বিস্তারে ভূমিকা রাখে।
শীতল আবহাওয়ার প্রবণতাতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশক থেকে চলতি দশক পর্যন্ত শীতকালের একটি গড় দিনে শৈত্যপ্রবাহ ও তীব্র শৈত্যের প্রভাবে থাকা পৃথিবীর এলাকার পরিমাণ প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে।
স্বাস্থ্য, কৃষি ও প্রকৃতির ওপর বাড়তি চাপ
দীর্ঘস্থায়ী তীব্র গরম মানুষের শরীরে সরাসরি প্রভাব ফেলে। প্রচণ্ড গরমে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক এবং হৃদ্যন্ত্র ও কিডনির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। বাইরে কাজ করা শ্রমিক, বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিরা বিশেষ ঝুঁকিতে থাকেন।
তাপের প্রভাব গর্ভাবস্থার ওপরও পড়তে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে মৃত সন্তান প্রসব এবং প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার মতো গর্ভকালীন জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
কৃষিও তীব্র দাবদাহের বড় শিকার। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়, সেচের পানির চাহিদা বাড়ে এবং ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। অতিরিক্ত তাপে গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ও উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে বনভূমি ও জলাভূমি শুকিয়ে গেলে দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে এবং বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাপজনিত মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করাও কঠিন। কারণ, অতিরিক্ত গরমের কারণে সৃষ্ট শারীরিক জটিলতা অনেক সময় হৃদ্রোগ, কিডনির সমস্যা বা অন্য রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে নথিভুক্ত হয়। ফলে তাপের কারণে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তা সরকারি পরিসংখ্যানে পুরোপুরি উঠে নাও আসতে পারে।
প্রতিবেদনে তাপজনিত কারণে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যুর হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখায়, অতিরিক্ত গরম শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্যঝুঁকিও।
দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে চরম গরমের পর্যায়
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় তাপপ্রবাহগুলো এখন অনেক সময় একটির পর আরেকটি ঘটছে। কখনো একাধিক তাপপ্রবাহ একই সময়ে সক্রিয় থাকছে, আবার কখনো একটির সঙ্গে আরেকটি মিশে যাচ্ছে বা আলাদা হয়ে নতুন তাপপ্রবাহ তৈরি করছে। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে চরম গরমের পরিস্থিতি বজায় থাকছে।
১৯৬০-এর দশকে এ ধরনের ধারাবাহিক তাপপ্রবাহের পর্যায় গড়ে প্রায় দুই মাস স্থায়ী হতো। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে তা বেড়ে প্রায় নয় মাসে পৌঁছায়। এরপর ২০০৮ সালের ৬ জুলাই শুরু হওয়া একটি ধারাবাহিক পর্যায় ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চলছিল। হিসাব অনুযায়ী, টানা ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও অন্তত একটি বড় তাপপ্রবাহ সক্রিয় ছিল।
১৯৬০ সাল থেকে ২০০৮ সালে এই দীর্ঘ ধারাবাহিক পর্যায় শুরুর আগপর্যন্ত পৃথিবীর মোট এলাকার ১০ শতাংশের বেশি বিস্তৃত মাত্র পাঁচটি বড় তাপপ্রবাহ শনাক্ত হয়েছিল। এরপর থেকে চলমান ধারাবাহিকতায় এমন ৫৬টি বড় তাপপ্রবাহ শনাক্ত করা হয়েছে।
এসব পরিবর্তন বোঝার জন্য একটি বিশেষ অনলাইন ট্র্যাকার চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা ও অতীতের তথ্য তুলনা করে তীব্র দাবদাহের বিস্তার পর্যবেক্ষণ করা যায়।
আগাম প্রস্তুতি কেন জরুরি
জলবায়ু পরিবর্তনের পরিসংখ্যান অনেকের কাছে বিমূর্ত মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী গরম, ফসলহানি, দাবানল, পানির সংকট ও তাপজনিত অসুস্থতা মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এসব ঘটনা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে চরম তাপের ব্যাপ্তি ও ঝুঁকি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
তীব্র দাবদাহের বিস্তার ও স্থায়িত্ব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গেলে সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আগাম প্রস্তুতি নিতে পারবে। তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
চরম তাপ এখন আর শুধু গ্রীষ্মের সাময়িক অস্বস্তি নয়। এর প্রভাব ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে এবং মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য তথ্য, আগাম সতর্কতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিকল্পনার গুরুত্বও বাড়ছে।
সূত্র: রয়টার্স

