ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা এই রাজনীতিক আশির দশকে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হওয়ার মধ্য দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। পরে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ধাপে ধাপে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাকে শপথ পড়াবেন। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এরই মধ্যে বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের শুরু স্থানীয় পর্যায়ে হলেও খুব দ্রুতই তিনি জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত হয়ে ওঠেন। আশির দশকে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর দলটির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বিএনপির সংকটময় সময়গুলোতেও দলের নেতৃত্বে ছিলেন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালে মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরে ২০১৬ সালে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার কারাবরণ ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থানের সময় দলীয় কার্যক্রম পরিচালনাতেও মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখার পাশাপাশি গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। এর আগে তিনি ঠাকুরগাঁও থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মির্জা ফখরুল। জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী জোটের প্রার্থী ও এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন। ভোটগ্রহণ শেষে ৩৪৩টি ভোট গণনা করা হয়। ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। পরে নির্বাচন কমিশন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
ফলাফল ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে লাল গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। পরে সংসদ সদস্যরাও তাকে অভিনন্দন জানান।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় মির্জা ফখরুল আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বিদায়ী বক্তব্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলীয় সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কোনো ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা চান তিনি। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর দলীয় রাজনীতির সক্রিয় ভূমিকা থেকে সাংবিধানিক দায়িত্বে তার নতুন অধ্যায় শুরু হবে—এমন কথাও উঠে আসে ওই সভায়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এখন তার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলা নতুন এক দায়িত্বের দিকে মোড় নিচ্ছে। দলীয় রাজনীতিতে চার দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে মির্জা ফখরুল কী ভূমিকা রাখেন, সেটিই এখন সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

