আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারত-চীন সীমান্তের লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ২০২০ সালের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে নয়াদিল্লি। এর প্রভাব পড়েছে বলিউডেও।
চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের অংশ হিসেবে ভারত সরকার বলিউডে চীনবিরোধী বা চীনকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সেন্সর কর্তৃপক্ষের নতুন নির্দেশনার ফলে গালওয়ান সংঘর্ষভিত্তিক একাধিক চলচ্চিত্রে নাম পরিবর্তন, দৃশ্য বাদ দেওয়া কিংবা প্রকল্প স্থগিতের ঘটনা ঘটছে।
এর মধ্যে রয়েছে সালমান খানের যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ব্যাটল অব গালওয়ান’। সরকারি আপত্তির মুখে ছবিটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘মাতৃভূমি: মে ওয়ার রেস্ট ইন পিস’। পাশাপাশি চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সমালোচনার পর ছবিটির প্রায় ৪০ শতাংশ দৃশ্য পুনরায় ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, গালওয়ান সংঘর্ষে নিহত বীর চক্র পদকপ্রাপ্ত ভারতীয় সেনাসদস্য সিপাহী গুরতেজ সিংয়ের জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘দ্য লায়ন অব গালওয়ান’-এর কাজ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছেন প্রযোজক হিমালয় দাসানি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আমাদের স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, কোনোভাবেই চীনবিরোধী বার্তা দেওয়া যাবে না। যুদ্ধের মূল প্রতিপক্ষকেই যদি দেখানো না যায়, তাহলে এমন সিনেমা নির্মাণের অর্থ থাকে না।”
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, চীন বা সীমান্ত সংঘাত নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের আগে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (এনওসি) নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সরকারের এ নীতির সমালোচনা করেছেন ভারতের বেশ কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক ও শিক্ষাবিদ। তাঁদের দাবি, এটি চলচ্চিত্রে নির্বাচিত বাকস্বাধীনতার উদাহরণ। চলচ্চিত্র নির্মাতা ওনিল বলেন, “পাকিস্তানবিরোধী চলচ্চিত্রে কোনো বাধা নেই, কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। অথচ গত বছরের ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সময় চীন পাকিস্তানকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়েছিল।”
ডকুমেন্টারি নির্মাতা অদিতি শর্মা বলেন, “পাকিস্তানবিরোধী চলচ্চিত্র ‘ধুরন্ধর’-এর ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্য পরিবর্তন বা বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়নি। বার্তাটি পরিষ্কার—পাকিস্তানকে আক্রমণ করা যাবে, কিন্তু চীনকে নয়।”
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেমা স্টাডিজ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ইরা ভাস্করের মতে, ভারতে বাকস্বাধীনতার প্রশ্ন প্রায়ই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
তবে সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন ভারতের অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জি. ডি. বকশি। তিনি বলেন, “চীন যদি সীমান্ত চুক্তি মেনে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়, তাহলে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা তৈরির প্রয়োজন নেই। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় সরকার কিছু পরিবর্তনের অনুরোধ করতেই পারে। সেনাদের বীরত্বের গল্প ভবিষ্যতেও তুলে ধরা যাবে।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের শেষ দিকে ভারত ও চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত সমঝোতায় পৌঁছায়। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই প্রচেষ্টার প্রভাবই এখন বলিউডের কনটেন্ট নীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে।

