আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে কম বেতন, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। ফ্রান্সে সেপ্টেম্বরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরুর পর ইউরোপের আরও অন্তত সাতটি দেশের তরুণেরা এতে যোগ দিয়েছেন।
স্পেন ও পর্তুগালের তরুণেরা রাজধানী শহরগুলোতে তাঁবু খাটিয়ে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। ফ্রান্স ও ইতালির শিক্ষার্থীরা স্কুলের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার উন্নতির দাবিতে মিছিল করছেন। এসব বিক্ষোভের কিছু ঘটনায় লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। গ্রিসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও অর্থ বরাদ্দের দাবিতে আন্দোলন চলছে। আর আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী বৃহত্তর বিক্ষোভের সময় তরুণদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকারের নীতির কারণে তাঁদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দেশভেদে দাবির পার্থক্য থাকলেও বিক্ষোভগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন বিষয় রয়েছে—নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ ও হতাশা। মাদ্রিদের কেন্দ্রস্থলে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নেওয়া ২৭ বছর বয়সী কনসার্ট মঞ্চকর্মী সাচা কসি বলেন, ‘ভবিষ্যৎহীন প্রজন্ম আবার ফিরে এসেছে।’ তাঁর ভাষায়, কম বেতন, আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবিলায় নিজেদের অসহায়ত্ব এবং চাকরি পাওয়ার অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে কল্যাণমূলক সুবিধা হারানোর আশঙ্কাও তাঁদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।
ইউরোপের জনসংখ্যায় বয়স্ক মানুষের অনুপাত বাড়ছে। পেনশন ও সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের চাপও বাড়ছে। কিন্তু কর বাড়ানোর বিষয়ে সরকারগুলোর অনীহা রয়েছে। অন্যদিকে, অভিবাসন ইস্যু ভোটারদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় ইউরোপ পিছিয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার আগ্রাসন, ডেনমার্ককে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি এবং ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সমর্থন কমে যাওয়ার উদ্বেগ।
পেনশন, শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো জনসেবামূলক খাতের ব্যয় দীর্ঘ মেয়াদে বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা-সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় ইউরোপের দেশগুলোকে সামরিক ব্যয় বাড়ানোর চাপও সামলাতে হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সরকার এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ইতালির পাদুয়া শহরের ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী স্টেলা সালিস বলেন, তরুণদের মধ্যে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতি ও ক্লান্তি জমে উঠেছে।
২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর ইউরোপজুড়ে কঠোর ব্যয়সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে যে বড় আন্দোলন হয়েছিল, বর্তমান বিক্ষোভ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে এক দেশের আন্দোলন অন্য দেশের তরুণদেরও উৎসাহিত করছে। ফ্রান্সের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বেলজিয়ামের তরুণদের অনুপ্রাণিত করেছে। ইতালি ও জার্মানির বিক্ষোভকারীরাও ফ্রান্সে শুরু হওয়া একটি স্লোগান ব্যবহার করছেন।
তবে বিক্ষোভের মধ্যে সহিংসতা ও অস্থিরতার ঘটনা উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করছে। উত্তর ইতালিতে দাঙ্গার ঘটনায় কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটির রাজনীতিক মাত্তেও সালভিনি মিলানকে ‘অপরাধীদের’ হাত থেকে রক্ষায় ৫০০ সেনা মোতায়েনের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি অভিবাসনবিরোধী অবস্থান তুলে ধরেছেন। ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি দলও আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সক্ষমতার কথা বলছে। মেরিন লে পেন ও জর্দান বারদেলাও এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন।
মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণপত্রের সুদের হার বৃদ্ধি এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারগুলোর বাজেট প্রণয়ন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় করা হবে, তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। ফ্রান্সের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সালোমে রেনো বলেন, তিনি এমন একটি চাকরি চান, যা করতে তাঁর ভালো লাগবে এবং প্রতি মাসে সংসারের খরচ মেটানো নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আবাসন ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন করছেন ২৯ বছর বয়সী মনোবিজ্ঞানী মোরানা মন্টেইরো। তাঁর অভিযোগ, আবাসন খাতে জল্পনামূলক বিনিয়োগের কারণে বাড়ির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাড়িভাড়া, বিল ও পরিবারের খরচ বহন করা সম্ভব না হলে কাজ করে যাওয়ার অর্থ কী? শনিবার থেকে সেখানে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান চলছে। সামনে শিক্ষকদের ধর্মঘটেরও কর্মসূচি রয়েছে।
আলবেনিয়ায় ‘ফ্লেমিঙ্গো’ নামে একটি আন্দোলনও তরুণদের অসন্তোষের প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। আলবেনিয়ার জভেরনেক এলাকার কাছাকাছি ফ্লেমিঙ্গো পাখির আবাসস্থলকে কেন্দ্র করে আন্দোলনটির নামকরণ করা হয়েছে। ওই এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের একটি বড় বিলাসবহুল পর্যটন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর বিরোধিতার মুখে পড়েছে। আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষার দাবিতে সরব হয়েছেন।
আলবেনিয়ার ২২ বছর বয়সী অভিনেতা রেদজান শকেম্বি বলেন, তাঁর প্রজন্ম আর নীরব থাকবে না। তাঁর মতে, ১৯৯১ সালে একনায়কতন্ত্রের অবসানের আগে তাঁর বাবা-মায়ের প্রজন্ম যে স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারেনি, বর্তমান তরুণেরা সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। জভেরনেকে প্রায় ১৫০ দিন আগে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। আন্দোলনকারীরা শিক্ষা ও সরকারি হাসপাতালের জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো এবং আরও স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক আলবেনিয়া গড়ার দাবি জানাচ্ছেন।

