নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও তদন্ত দক্ষতা বাড়াতে বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার এবং স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি, এসব অপরাধের তদন্তে দক্ষ জনবল তৈরিতে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া ১ অক্টোবর ঢাকায় ৪ হাজার ৫৯২ সদস্যের একটি স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে পরিচালিত ইউনিটটি সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় কাজ করবে। বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়েও এ ধরনের অপরাধ তদন্তে পৃথক কার্যক্রম বা ডেস্ক রয়েছে।
সাইবার অপরাধের কারণে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক বিপর্যয় ও সামাজিক মর্যাদাহানির শিকার হচ্ছেন অনেকে। ভুয়া পরিচয়ে অনলাইনে হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, হ্যাকিং, তথ্য চুরি এবং অনলাইন ব্যাংকিংয়ে প্রতারণার মতো ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) বলেন, সাইবার জালিয়াতি, হ্যাকিং ও অনলাইন হয়রানির মামলাগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব অপরাধ দমনে নিয়মিত নজরদারি ও টহলও পরিচালনা করা হচ্ছে।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধসংক্রান্ত ১৯১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) এবং ১৫৯টি সিআর (ক্রিমিনাল রেজিস্টার) মামলা। একই সময়ে সাইবার অপরাধের অভিযোগে ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সাইবার অপরাধ তদন্তে কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে সাইবার ট্রেনিং সেন্টার, ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে নতুন মডিউল যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি, পুলিশ সদরদপ্তরের উদ্যোগে দেশব্যাপী ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স চালু হয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ স্টাফ কলেজে ১০ দিনব্যাপী এ ধরনের প্রশিক্ষণে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, সাইবার অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, ডিবিতে সাইবার ল্যাব রয়েছে। এ ছাড়া কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটে একটি ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল অপরাধের মামলা তদন্তে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হবে।
ডিএমপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত রাজধানীর আটটি পুলিশ বিভাগে সাইবার অপরাধের মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। রমনা বিভাগে ৮৮টি মামলায় ১৬৩ জন, লালবাগে ২২টি মামলায় ২৩ জন, ওয়ারীতে ১২টি মামলায় ২৪ জন, মতিঝিলে ৩৩টি মামলায় ৪৯ জন, তেজগাঁওয়ে ৫৩টি মামলায় ৪৯ জন, মিরপুরে ৩৩টি মামলায় ২৭ জন, গুলশানে ৩৮টি মামলায় ৩৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৬টি মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অনলাইন প্রতারণার একটি কৌশল হলো ঘরে বসে খণ্ডকালীন কাজ কিংবা ভিডিওতে ‘লাইক’ দিয়ে আয় করার প্রলোভন দেখানো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে প্রথমে অল্প টাকা দিয়ে আস্থা অর্জন করা হয়। পরে বিভিন্ন কাজের নামে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে প্ররোচিত করে প্রতারকেরা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। এ ধরনের প্রতারণায় শিক্ষার্থী, গৃহিণী ও বেকার তরুণদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ভুয়া ফোনকল, ওটিপি হাতিয়ে নেওয়া, ডিপফেক ভিডিও, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে অনেকে সঞ্চয় হারাচ্ছেন। এসব ঘটনার মানসিক ও সামাজিক প্রভাবও গুরুতর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল পাসওয়ার্ড, অপরিচিত লিংকে প্রবেশ, ভুয়া ওয়েবসাইট ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই অপরিচিত কাউকে পিন বা ওটিপি না দেওয়া, সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

