আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরাকে দুই দশকের বেশি সময়ের মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটেছে। দেশটিতে থাকা শেষ মার্কিন সেনারাও প্রত্যাহার হওয়ায় ২০০৩ সালে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক উপস্থিতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। প্রত্যাহারকে ইরাকের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে দেশটির সরকার। তবে এর পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ইরাক থেকে শেষ মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশনও শেষ হলো। প্রত্যাহারের পর দেশটির নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব ইরাকি বাহিনীর ওপরই থাকছে। এ উপলক্ষে ইরাকে চার দিনের জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের সময়সীমা ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত ১২ আগস্ট ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি জানান, এই সময়সীমা চূড়ান্ত। এর আগে ২০২৪ সালে ওয়াশিংটন ও বাগদাদ মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক মিশন ধাপে ধাপে শেষ করার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়।
মার্কিন বাহিনী এরই মধ্যে ইরাকের অধিকাংশ এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নিয়েছিল। শেষ পর্যায়ে দেশটির উত্তরাঞ্চলের আধা স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে থাকা সেনাদেরও প্রত্যাহার করা হয়। ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্র এখন সামরিক উপস্থিতির পরিবর্তে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে।
ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সূচনা হয় ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের মধ্য দিয়ে। ২০০৭ সালে দেশটিতে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে শেষ মার্কিন যুদ্ধসেনারা ইরাক ছাড়ে। তবে ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর তাদের আবার ইরাকে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ইরাকি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য ও নজরদারি সহায়তা দিয়ে আসছিল মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে। তাদের বক্তব্য, বিদেশি সামরিক উপস্থিতির অবসানের মধ্য দিয়ে ইরাক আরও বেশি সার্বভৌম হয়ে উঠেছে। তবে ইরাকের কিছু কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকের আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার ফলে নিরাপত্তা-শূন্যতা তৈরি হলে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহার ইরানে কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। কারণ, ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের প্রভাবের একটি ভারসাম্য হিসেবে কাজ করেছে। একই সঙ্গে ইরাকের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, আকাশ নজরদারি ও অন্যান্য সহায়তা না থাকলে ইসলামিক স্টেটের ঘুমন্ত নেটওয়ার্কগুলোও আবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে বলেছেন, গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে নিরাপত্তা-শূন্যতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক উপস্থিতি ছাড়া ইরাকের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
তবে ইরাকি সরকার বলছে, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী এখন নিজস্ব ভূখণ্ডের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না; বরং সামরিক মিশনের পরিবর্তে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন পর্যায় শুরু হচ্ছে।

