আন্তর্জাতিক ডেস্ক
তীব্র তহবিল সংকটের কারণে প্রায় ৮৩ লাখ শরণার্থী ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষ জরুরি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। অর্থসংকটের কারণে তাদের সুরক্ষা ও সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমও ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইউএনএইচসিআর জানায়, দীর্ঘদিনের অর্থসংকটের কারণে শরণার্থী, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ও রাষ্ট্রহীন মানুষের সুরক্ষা এবং সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ২০২৬ সালে সংস্থাটির এসব কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজন ৮৫০ কোটি ডলার। কিন্তু জুলাইয়ের শেষ নাগাদ পাওয়া গেছে মাত্র ৩২ শতাংশ বা প্রায় ২৭০ কোটি ডলার।
ইউএনএইচসিআর জানায়, ২০২৪ সালে তাদের হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫২০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে তা কমে প্রায় ৩৯০ কোটি ডলারে নেমে আসে। অথচ বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এখনো অত্যন্ত বেশি। ২০২৫ সালে সংস্থাটি ৩ কোটি ৫৬ লাখ শরণার্থীসহ বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য সহায়তা দিয়েছে।
অর্থের ঘাটতির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন বাস্তুচ্যুতি সংকটে নিবন্ধন, শিশু সুরক্ষা, যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা এবং অন্যান্য জরুরি সেবা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ইউএনএইচসিআর বলেছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালু রাখতে তারা বিভিন্ন সংস্কার ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু অর্থসংকটের ব্যাপকতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে এখন জরুরি কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইউএনএইচসিআরের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক প্রধান ডমিনিক হাইড বলেন, সুরক্ষা কার্যক্রম অনির্দিষ্টকাল কমিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে অর্থায়ন নেমে গেলে শুধু কমসংখ্যক মানুষ সেবা পাবেন এমন নয়, বরং পুরো সেবাব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চাদে প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার শরণার্থী নিবন্ধনসংক্রান্ত বিলম্বের মুখে রয়েছেন। এতে তারা বিভিন্ন সেবা পাওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। একই দেশে বিপুলসংখ্যক শিশু শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইথিওপিয়ার কোনো কোনো এলাকায় শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অন্যদিকে সুদানে যৌন সহিংসতার শিকার মানুষ এবং গুরুতর ঝুঁকিতে থাকা শিশুরাও গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা সেবা হারাতে পারেন বলে সতর্ক করেছে ইউএনএইচসিআর।
ডমিনিক হাইড বলেন, শরণার্থীদের নিবন্ধন বন্ধ হয়ে গেলে বা শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম না থাকলে, বাস্তুচ্যুত হওয়ার আগে মানুষ যে সহিংসতা, শোষণ ও নির্যাতন থেকে পালিয়ে এসেছিলেন, সেই ঝুঁকিগুলো আবারও তাদের জীবনে ফিরে আসতে পারে।
অর্থসংকটের প্রভাব ইউএনএইচসিআরের নিজস্ব কার্যক্রমেও পড়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তহবিল কমে যাওয়ায় কর্মীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশে কার্যক্রম সংকুচিত করা হয়েছে। ইউএনএইচসিআরের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর সংস্থাটির হাতে থাকা অর্থ কমে ৩৯৩ কোটি ডলারে নেমেছিল, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১২৪ কোটি ডলার কম।
ইউএনএইচসিআর বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় দাতাদের বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য দাতারাও ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে শুধু জরুরি সহায়তা নয়, বাস্তুচ্যুত মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর করে তোলার প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বে ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত ছিলেন। একই সময়ে ইউএনএইচসিআরের আওতাধীন শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি ৫৬ লাখ। ২০২৬ সালে সংস্থাটি মোট ৮৫০ কোটি ৫০ লাখ ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে।
ইউএনএইচসিআর সতর্ক করেছে, দ্রুত নতুন অর্থ না এলে বিভিন্ন দেশে নিবন্ধন, সুরক্ষা, জরুরি আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও সংকুচিত হতে পারে। এতে ইতোমধ্যে ঝুঁকিতে থাকা শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

