আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী ‘মিউজ’ চালুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটার শেয়ারের দামে বড় উত্থান হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিউজ থেকে বিজ্ঞাপনের বাইরে নতুন আয়ের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ বাড়ায় চলতি সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ার গত বছরের গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) মেটার শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এর আগে সোমবার এক দিনেই শেয়ারের দাম ১১ শতাংশের বেশি বাড়ে, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর এক দিনে সর্বোচ্চ উত্থান। বৃহস্পতিবার শেয়ারপ্রতি দাম ছিল প্রায় ৭৭৮ ডলার। মার্চের শেষ দিকে দাম নেমে প্রায় ৫২৫ ডলারে দাঁড়িয়েছিল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল বিনিয়োগ মেটার জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। চলতি বছর এ খাতে কোম্পানিটির ব্যয় ১৪৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। মেটার আয়ের প্রায় পুরোটাই বিজ্ঞাপননির্ভর হওয়ায় এত বড় বিনিয়োগ থেকে শেষ পর্যন্ত কতটা আর্থিক সুফল আসবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মিউজকে নতুন আয়ের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মিউজ চালু করা হয়। পরবর্তীতে কানাডাতেও এর ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে এই দুই দেশেই এটি ব্যবহার করা যাচ্ছে। ১৮ বছরের বেশি বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য চালু মিউজ বিনামূল্যে ব্যবহার করা গেলেও এতে ব্যবহারের সীমা রয়েছে। বেশি ব্যবহারের জন্য মাসে ২০ ও ১০০ ডলারের দুটি ঐচ্ছিক সাবস্ক্রিপশন সুবিধাও রাখা হয়েছে।
মিউজ একটি বহুমুখী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারী, যা ব্যবহারকারীর হয়ে বিভিন্ন কাজ করতে পারে। এর মধ্যে ই-মেইল পাঠানো, ভ্রমণ বুকিং এবং অনলাইনে কেনাকাটার মতো কাজ রয়েছে। মেটার তথ্য অনুযায়ী, ব্যবহারকারীর নির্দেশে মিউজ বিভিন্ন অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
অ্যাপ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাপটোপিয়ার হিসাবে, চালুর দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে উত্তর আমেরিকায় আইফোনে মিউজ ১৮ লাখ বার ডাউনলোড হয়েছে। তুলনায়, অ্যাপ হিসেবে চালুর প্রথম একই সময়ের মধ্যে চ্যাটজিপিটির ডাউনলোড ছিল ১৩ লাখ। রয়টার্সের পরবর্তী হিসাবেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় মিউজের প্রাথমিক ব্যবহার দ্রুত বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
মেটার বার্ষিক সম্মেলনে কোম্পানিটি জানায়, শিগগিরই মিউজ তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চশমাতেও যুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে ওয়ালমার্ট, বেস্ট বাই, সেফোরা, ওয়েফেয়ারসহ বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে অংশীদারত্বের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব অংশীদারত্বের মাধ্যমে মিউজ ব্যবহার করে করা কেনাকাটা থেকে কমিশন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে মিউজ নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। অনলাইন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন মেটার মিউজকে তাদের ওয়েবসাইট ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার কথা জানিয়েছে। অ্যামাজনের অভিযোগ, মিউজ ওয়েবসাইটে প্রবেশের সময় নিজেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহকারী হিসেবে যথাযথভাবে পরিচয় দেয়নি এবং গ্রাহকের লগইন তথ্য সংরক্ষণ করেছে। মেটা অবশ্য বলেছে, মিউজ ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড বা অর্থপ্রদানের তথ্য দেখতে পায় না। মেটার নিজস্ব নথিতেও বলা হয়েছে, মিউজ নিরাপদভাবে ব্যবহারকারীর দেওয়া পরিচয়পত্র সংরক্ষণ করে এবং পাসওয়ার্ড বা অর্থপ্রদানের তথ্য দেখতে পায় না।
বৃহস্পতিবার বিনিয়োগ ব্যাংক জেপিমরগ্যান মেটার শেয়ারের লক্ষ্যমাত্রা ৯২০ ডলারে উন্নীত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষকদের মতে, মিউজ চ্যাটজিপিটির পর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভোক্তাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেবাগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। তবে অন্য বিশ্লেষকেরা এখনও সতর্ক। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওপেনহাইমারের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অন্য অ্যাপের পাসওয়ার্ড মেটার কাছে সংরক্ষণ করতে আস্থা রাখেন। গুগলের ক্ষেত্রে এ হার ৩০ শতাংশ।
মিউজের সম্ভাব্য বিস্তারে মেটার বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি বড় সুবিধা হিসেবে কাজ করতে পারে। কোম্পানিটির দাবি, তাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দৈনিক ৩৬০ কোটির বেশি মানুষ সক্রিয় থাকেন। ফলে মিউজ দ্রুত বড়সংখ্যক ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছাতে পারলে বিজ্ঞাপনের বাইরে নতুন আয়ের একটি বড় ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

