স্পোর্টস ডেস্ক
ম্যাচের বয়স তখনো দেড় মিনিটও হয়নি। এরই মধ্যে স্কটল্যান্ডের জালে বল জড়িয়ে বিশ্বকাপের নতুন দ্রুততম গোলের রেকর্ড গড়ে ফেলেছেন ইসমাইল সাইবারি। সেই এক গোলেই স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের দিকে বড় এক ধাপ এগিয়ে গেল মরক্কো।
শুক্রবার (১৯ জুন) ফক্সবরোর জিলেট স্টেডিয়ামে ম্যাচজুড়ে আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজ ও আজদিন উনাহিদের দাপুটে ফুটবলের সামনে স্কটিশরা ছিল অনেকটাই অসহায়। এই পরাজয়ে গ্রুপ পর্বের সমীকরণ জটিল হয়ে গেছে স্টিভ ক্লার্কের দলের জন্য, আর মরক্কো শক্ত করেছে শেষ ৩২-এ ওঠার সম্ভাবনা।
অনুষ্ঠিত গ্রুপ পর্বের এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শুরু থেকেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ রাখে উত্তর আফ্রিকার দলটি। ম্যাচের মাত্র ৭১ সেকেন্ডে ব্রাহিম দিয়াজের নিখুঁত পাস থেকে স্কটিশ রক্ষণভাগের ভুল অবস্থানের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন পিএসভি আইন্দহোভেন তারকা ইসমাইল সাইবারি। অ্যাঙ্গাস গানের সামনে কোনো সুযোগ না রেখে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠিয়ে মরক্কোকে এগিয়ে দেন তিনি। একই সঙ্গে এবারের বিশ্বকাপের দ্রুততম গোলের রেকর্ডও নিজের করে নেন।
শুরুর ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই স্কটল্যান্ডের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে মরক্কো। ১০ মিনিটে আজদিন উনাহির দারুণ এক ক্রস থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে সাইবারি ও ব্রাহিম দিয়াজ কেউই বলের নাগাল না পাওয়ায় বেঁচে যায় স্কটিশরা।
প্রথমার্ধজুড়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল মরক্কোর মাঝমাঠের হাতে। উনাহি, এল আয়নাউই ও তরুণ আইয়ুব বুআদ্দির সমন্বয়ে গড়া মিডফিল্ড ত্রয়ী কার্যত ম্যাচ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসা স্কট ম্যাকটমিনেকে। বলের দখল, পাসিং এবং ট্রানজিশন—সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল ওয়ালিদ রেগরাগুইয়ের দল।
৪১তম মিনিটে ডাগআউট থেকে স্টিভ ক্লার্ককে বারবার নির্দেশনা দিতে দেখা যায়, যা স্কটল্যান্ডের অস্বস্তিকর অবস্থাকেই স্পষ্ট করে তুলছিল। বিরতির আগে অবশ্য একবার সমতায় ফেরার সুযোগ পেয়েছিল তারা। ৪৩তম মিনিটে লুইস ফার্গুসনের ফ্রি-কিক থেকে তৈরি হওয়া সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি স্কটিশ আক্রমণভাগ। যোগ করা সময়ে কাইরেন টিয়ার্নির পরপর দুটি প্রচেষ্টাও মরক্কোর রক্ষণভাগ প্রতিহত করলে ১-০ ব্যবধানেই প্রথমার্ধ শেষ হয়।
বিরতির পর ম্যাচে ফেরার মরিয়া চেষ্টা শুরু করে স্কটল্যান্ড। উচ্চগতির প্রেসিং ফুটবলে মরক্কোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা চালায় তারা। ৫০তম মিনিটে জন ম্যাকগিন বক্সের ভেতরে পড়ে গেলে পেনাল্টির জোরালো আবেদন ওঠে। তবে ভিএআর পর্যালোচনার পর রেফারি খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
দুই মিনিট পরই আবারও স্কটিশ সমর্থকদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয় মরক্কো। দ্রুতগতির এক পাল্টা আক্রমণ থেকে সাইবারির জোরালো শট গোলপোস্টের বারে লেগে ফিরে আসে। আরেকটু এদিক-ওদিক হলেই ম্যাচের ভাগ্য সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যেতে পারত।
৫৯তম মিনিটে ইনজুরির কারণে কাইরেন টিয়ার্নিকে মাঠ ছাড়তে হলে আরও চাপে পড়ে স্কটল্যান্ড। তার জায়গায় নামানো হয় বেন গ্যানন-ডোককে। এরপর ম্যাচের শেষ দিকে আক্রমণভাগে বাড়তি শক্তি যোগ করতে লিন্ডন ডাইকস ও রায়ান ম্যাকলিনকে মাঠে নামান ক্লার্ক।
শেষ ১৫ মিনিটে স্কটল্যান্ড প্রায় সর্বশক্তি নিয়েই আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ৮২তম মিনিটে ম্যাকটমিনে বক্সের ভেতর ফাউলের শিকার হয়েছেন বলে দাবি তুললেও রেফারি তাতে সাড়া দেননি। তিন মিনিট পর নেপোলি মিডফিল্ডারের একটি শট সাইড নেটিংয়ে আঘাত করলে গ্যালারির একাংশ মুহূর্তের জন্য গোল ভেবে উল্লাসে ফেটে পড়ে। কিন্তু হতাশাই ছিল তাদের শেষ সঙ্গী।
নির্ধারিত সময় শেষে যোগ করা ছয় মিনিটেও স্কটল্যান্ড মরক্কোর রক্ষণভাগ ভাঙতে পারেনি। বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংগঠিত রক্ষণ আর দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে প্রতিপক্ষকে ব্যস্ত রেখেছে মরক্কো। শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে উত্তর আফ্রিকার সমর্থকেরা। অন্যদিকে, স্কটল্যান্ডের সামনে রেখে যায় কঠিন এক সমীকরণ।
মাত্র ৭১ সেকেন্ডের এক ঝলক জাদু দিয়ে ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন ইসমাইল সাইবারি। কিন্তু এই জয় শুধু একটি গোলের গল্প নয়। এটি ছিল মরক্কোর কৌশলগত শৃঙ্খলা, মাঝমাঠের আধিপত্য এবং বড় মঞ্চে পরিণত ফুটবল খেলার আরেকটি উজ্জ্বল প্রদর্শনী। ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্টরা যে এবারও বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখছে, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সেই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট করে দিল।

