বিনোদন ডেস্ক
সংগীতের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ শুধু গান গায় না, বরং একটি সময় ও প্রজন্মের অনুভূতিকে ধারণ করে। প্রেম, বিরহ, জীবন ও দেশ—বিচিত্র অনুষঙ্গ উঠে এসেছে ফারুক মাহফুজ আনাম জেমসের গানে। গিটার হাতে মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি, গভীর কণ্ঠ এবং স্বতন্ত্র গায়কি কয়েক দশক ধরে শ্রোতাদের কাছে তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) নগরবাউল জেমসের ৬২তম জন্মদিন। ১৯৬৪ সালের এই দিনে নওগাঁয় জন্ম নেওয়া জেমসের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। সংগীতের প্রতি গভীর টান থেকেই কৈশোরে পরিবারের সঙ্গে মতবিরোধের পর ঘর ছেড়ে চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে থাকতে শুরু করেন তিনি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাঁর সংগীতজীবনের ভিত।
১৯৮০ সালে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ড গঠনের মধ্য দিয়ে পেশাদার সংগীতজগতে যাত্রা শুরু করেন জেমস। ব্যান্ডটির প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও লিড গিটারিস্ট হিসেবে তিনি নিজের স্বতন্ত্র গায়কির পরিচয় তৈরি করেন। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় ফিলিংসের প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’। পরের বছর একক অ্যালবাম ‘অনন্যা’ প্রকাশের পর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে।
এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ফিলিংসের ‘জেল থেকে বলছি’ (১৯৯০), ‘নগর বাউল’ (১৯৯৬), ‘লেইস ফিতা লেইস’ (১৯৯৮) ও ‘কালেকশন অব ফিলিংস’ (১৯৯৯)। পরবর্তী সময়ে ফিলিংসের নাম পরিবর্তন করে ‘নগর বাউল’ রাখা হয়। নামটি পরে জেমসের সংগীতপরিচয়ের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
ব্যান্ডের পাশাপাশি একক শিল্পী হিসেবেও জেমসের রয়েছে দীর্ঘ সফল ক্যারিয়ার। ‘পালাবি কোথায়’ (১৯৯৫), ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’ (১৯৯৭), ‘ঠিক আছে বন্ধু’ (১৯৯৯), ‘আমি তোমাদেরই লোক’ (২০০৩), ‘জনতা এক্সপ্রেস’ (২০০৫), ‘তুফান’ (২০০৬) ও ‘কাল যমুনা’ (২০০৯) তাঁর উল্লেখযোগ্য একক অ্যালবামগুলোর মধ্যে রয়েছে।
জেমসের কণ্ঠে ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেব’, ‘মা’, ‘বাংলাদেশ’, ‘পাগলা হাওয়া’, ‘দুষ্টু ছেলের দল’, ‘গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া’ ও ‘মিরাবাই’-এর মতো গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ভক্তদের ভালোবাসায় ‘গুরু’ নামেও পরিচিতি পেয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বলিউডেও কাজ করেছেন জেমস। ২০০৬ সালে অনুরাগ বসু পরিচালিত ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমার ‘ভিগি ভিগি’ গান দিয়ে বলিউডে প্লেব্যাক শুরু করেন তিনি। পরে ‘ওহ লামহে’, ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ ও ‘ওয়ার্নিং’-এর মতো সিনেমাতেও গান করেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও প্লেব্যাকের জন্য স্বীকৃতি পেয়েছেন জেমস। ‘দেশা: দ্য লিডার’ (২০১৪) ও ‘সত্তা’ (২০১৭) সিনেমায় গান গেয়ে সেরা পুরুষ প্লেব্যাক গায়ক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
সংগীতজীবনের চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে জেমস এখন বাংলাদেশের রকসংগীতের পরিচিত মুখ। প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে শ্রোতাদের রুচি ও সংগীতের ধারা; তবে মঞ্চে গিটার হাতে তাঁর উপস্থিতি এবং স্বতন্ত্র কণ্ঠ এখনো শ্রোতাদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। গৃহত্যাগী সেই তরুণ আজ ৬২ বছরে পা দিয়ে ভক্তদের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত ‘নগরবাউল জেমস’।

